বাবার পছন্দের খাবার রাঁধলেন কন্যা

image_title

তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় প্রায়ই যেতেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ১৯৭৩ সালের কোনো একদিনও গেছেন বেড়াতে। বাসার এক সহকারী বললেন, ‘আজ রিমি মুরগি রান্না করেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘ইব্রাহিম সাহেব, আসেন।

আমার মেয়ে রান্না করেছে। আপনি খেয়ে যান।’ সে কথা ভেতরঘর থেকে শুনছিলেন তাজউদ্দীনকন্যা সিমিন হোসেন রিমি। ২৩ মার্চ ঢাকার বনানী ডিওএইচএসের বাড়িতে বসে বর্তমানে জাতীয় সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি শোনালেন সে গল্প। ‘সেটা ছিল মুরগির সোনালি ঝোল। আমরা রান্না করলে বাবা খুবই উৎসাহ নিয়ে তা খেতেন। তখন আমি সবে ক্লাস সেভেনে পড়ি। একটু ফুলিয়ে ডিম ভাজি করতাম, সেটাও আব্বা পছন্দ করতেন।’

সেদিন আমরা সিমিন হোসেনের বাসায় যে টেবিলে বসে কথা বলছিলাম, সেটা মুক্তিযুদ্ধকালের বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সময়কার টেবিল। ‘১৯৭১ ও ৭৫ সালে আমাদের বাড়ির অনেক কিছুই তো লুট হয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু সেই টেবিলটা আমি এনেছি, এখনো রেখে দিয়েছি। এই টেবিল কেনা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। আব্বাসহ আমরা এই টেবিলে বসে খেতাম।’

তাজউদ্দীন আহমদের পছন্দের খাবার

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই রান্নাবান্না করতেন? ‘বাবাকে তো আমরা খুব কম পেয়েছি। বেশির ভাগ সময়ই জেলে থাকতেন। আমার যখন সাড়ে চার বছর বয়স, তখন বাবাকে দেখি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্তই বাবাকে দেখতে পেরেছি।

তাই কম বয়সেই অনেক দায়িত্ব নিতে হয়েছে।’ সিমিন হোসেন রিমি শিখেছেন রান্না করতে করতে। মা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন অসাধারণ রান্না করতেন। মায়ের কাছ থেকে রান্নায় হাত পাকিয়েছেন মেয়েও। ‘কোনো দিন মসলাপাতি হিসাব করে দিই না। হাতের আন্দাজেই হয়ে যায়। আপনাদের রেসিপি লিখে দেওয়ার জন্য চা–চামচ, টেবিল চামচের হিসাব বের করতে হচ্ছে।’

সাধারণ জীবনযাপনে যেমন অভ্যস্ত ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, তেমনি খাবারের বেলায়ও। রিমির ভাষায়, ‘একদম সিম্পল। লবণ, ঝাল কম বা বেশি—কোনো দিন রান্না নিয়ে কোনো অনুযোগ ছিল না। সকালে আটার রুটি, ছানা, ডিম; দুপুরে মাছ, মুরগি, সবজি।’ একেবারেই বাঙালি খাবার পছন্দ করতেন। সে তালিকায় করলা, পুঁটি মাছের, মানে চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা, রুই মাছ—এগুলোই পছন্দ ছিল এই জাতীয় নেতার। রিমি বলেন, আমাদের গাজীপুর, কাপাসিয়া ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে চ্যাপা শুঁটকি বেশ খাওয়া হয়। আমরাও পছন্দ করি।

খাবারের বেলায় পুষ্টির দিকটাতে গুরুত্ব দিতেন। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন যেমন করতেন, তেমনি খাদ্যাভাস নিয়েও ছিলেন সচেতন। এই যুগে এসে যেসব বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, ৪৫ বছর আগেই সেসব তিনি ভেবেছিলেন। ১৯৭৪ সালে ৩ এপ্রিল ঢাকায় দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের খাদ্যাভাসটাকে ভবিষ্যতে পরিবর্তন করতে হবে। এ বিষয়টি দৃষ্টির সামনে রেখে এবং কীভাবে পরিবর্তন করতে হবে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। হঠাৎ একটা চাপিয়ে দিলেই হবে না। পরিবর্তন করতে হবে এটাকে দৃষ্টির সামনে রেখে এবং “ক্রপ প্যাটার্ন” কী হবে, সেটাও নির্ধারণ করতে হবে। এলোপাতাড়ি উৎপাদন করে গেলে হবে না।’

হাত ধোয়ার ব্যাপারটা সে সময়ই খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখতেন তাজউদ্দীন আহমদ। ‘খাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে তিনি হাত ধুতেন। মজার ব্যাপার হলো, হাত ধুয়ে দুধের ঘন সর তুলে নিয়ে একটা থালায় অল্প ভাতের ওপর রাখতেন। একটু লবণ নিয়ে সেটা মেখে এক লোকমা করে আমাদের ভাইবোন ও আম্মাকে খাওয়াতেন।’

সিমিন হোসেন রিমি এভাবে বলে চলেন তাঁর বাবার গল্প। আর ওদিকে নকশার পাঠকদের জন্য মেয়ে রিমির রান্না করা তাজউদ্দীন আহমদের পছন্দের খাবারের পাঁচ পদ আসতে থাকে টেবিলে। প্রতিটা পদের রংই সতেজ। সেই মুরগির সোনালি ঝোলও এল। জানা গেল, হলুদ ও মরিচের কারণে ঝোলের রং সোনালি, তাই এই নামকরণ। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় তাজউদ্দীন আহমদ যখন যেতেন, এলাকার মানুষ তাঁকে দাওয়াত দিতেন। সিমিন হোসেন রিমি বলেন, ‘অনেক পরে আমরা একটা বিষয় বুঝেছি। গ্রামের মানুষ বেশির ভাগই ছিলেন অসচ্ছল। আব্বা তাঁদের নির্দিষ্ট করে মেনু বলে দিতেন—মাষকলাইয়ের ডাল, সাদা ভাত, ভর্তা–ভাজি এ রকম। অনেক পরে এলাকার মানুষ বুঝেছেন, আসলে তাঁদের চাপে ফেলতে চাইতেন না। তাই কম খরচের খাবারগুলোর কথাই বলতেন তাঁর পছন্দ হিসেবে।’

এমনিতেও মাছের কাঁটাকুটো দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল খুবই পছন্দ করতেন তাজউদ্দীন আহমদ। জানা গেল, সিমিন হোসেন রিমিও সেটা বেশ ভালোই রান্না করতে পারেন। তবে এ যাত্রা সেটা চেখে দেখা হলো না।

রুই মাছে আলু টমেটো

উপকরণ
রুই মাছ ১ কেজি, পেঁয়াজ ৫–৬টি মাঝারি লম্বা করে কাটা, রসুন দেড় চা-চামচ, আদা ১ চা-চামচ (একটু কম), জিরা দেড় চা-চামচ, হলুদ ১ চা-চামচ (একটু কম), মরিচ ১ চা-চামচের তিন ভাগের দুই ভাগ, সরিষা বা সয়াবিন তেল ৫০ মিলিলিটার, টমেটো ২টি মাঝারি, আলু ২–৩টি মাঝারি, কাঁচা মরিচ ৮–১০টি, কাঁচা ধনেপাতা অল্প ও লবণ পরিমাণমতো।

প্রণালি
কড়াইতে তেল গরম হলে পেঁয়াজ দিয়ে নাড়তে হবে। একটু নরম হলে সব মসলা দিয়ে আলুসহ কিছুক্ষণ কষিয়ে নিন। মাছ দিয়ে প্রথম অল্প পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এই পানি শুকিয়ে এলে টমেটো ও কাঁচা মরিচ এবং আন্দাজমতো পানি দিতে হবে। পছন্দ অনুযায়ী পানি কমে এলে ধনেপাতা দিয়ে নামিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

বি.দ্র. অনেকে মাছ ভেজে রান্না করেন, সে ক্ষেত্রে এই মসলাতেই ভাজা মাছ দিয়ে রান্না করবেন।

চ্যাপা শুঁটকির সবুজ ভর্তা
উপকরণ
পুঁটি মাছের শুঁটকি ৬–৭টি, রসুন মোটা করে কাটা আধা কাপ, পেঁয়াজ মোটা করে কাটা ১ কাপ, কাঁচা মরিচ ৮–১০টি ও সরিষার তেল ১ চা-চামচ।

প্রণালি
প্রথম শুঁটকি বেছে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। মাথা ফেলে দেওয়া যায়। এরপর রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, সরিষার তেল এবং শুঁটকি মাছ অল্প পানি দিয়ে অল্প আঁচে চুলায় দিতে হবে। সেদ্ধ হয়ে গেলে আলতো করে পাটায় পিষে নিতে হবে। এমনভাবে পিষতে হবে, যেন পেঁয়াজ–রসুন আস্ত থেকে যায় বা আধা ভাঙা হয়। এরপর পরিবেশন করুন।

মুরগির সোনালি ঝোল
উপকরণ

দেশি মুরগি ১টি, পেঁয়াজ ৪–৫টি গোল মোটা করে কাটা, আদা ১ টেবিল চামচ, রসুন ১ টেবিল চামচের তিন ভাগের দুই ভাগ, ধনেবাটা ১ চা-চামচ, জিরাবাটা ১ চা-চামচ, হলুদ আধা চা-চামচের একটু বেশি, মরিচ আধা চা-চামচের একটু কম, দারুচিনি ২ টুকরা দেড় ইঞ্চি লম্বা, লবঙ্গ ৪–৫টি, সরিষা বা সয়াবিন তেল ৫০ মিলি লিটার (৪ টেবিল চামচ), তেজপাতা ২টি, পটোল ৪–৫টি, আলু ২টি মাঝারি (মাঝখান দিয়ে দুই টুকরা গোলাকার করে কাটা) ও লবণ পরিমাণমতো।
প্রণালি
জিরা ছাড়া একটি হাঁড়ি বা কড়াইতে সব মসলা, তেল ও মুরগি একসঙ্গে মেখে অল্প পানি দিয়ে চুলায় দিয়ে দিন। পানি একটু শুকিয়ে এলে আলু দিয়ে নেড়েচেড়ে নিজ আন্দাজমতো আবার পানি দিতে হবে। এই সময় জিরাবাটা দিয়ে নিন। আলু মুরগি সেদ্ধ হয়ে গেলে পটোল দিতে হবে। কিছুক্ষণ পর তৈরি হয়ে গেল মুরগির সোনালি ঝোল। ঝাল পছন্দ অনুযায়ী বেশি-কম করা যাবে।

নারকেলের দুধে চিংড়ি
উপকরণ
চিংড়ি মাছ ১ কেজি (কেজিতে ১৬–১৮টি), পেঁয়াজ ৪–৫টি মাঝারি কুচি করে কাটা, আদাবাটা দেড় চা-চামচ, রসুন দেড় চা-চামচ, ধনেগুঁড়া ১ চা-চামচ উঁচু করে, দারুচিনি ২ টুকরা ১ ইঞ্চি লম্বা, লবঙ্গ ৪–৫টি, কালো গোলমরিচ ১ চা-চামচ, নারকেলের দুধ ১টি নারকেল থেকে নিতে হবে অথবা কৌটাজাত নারকেল দুধ ২৫০ মিলিলিটার, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, মরিচগুঁড়া পৌনে চা-চামচ, তেল ২ টেবিল চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, কাঁচা ধনেপাতা অল্প, লবণ পরিমাণমতো ও কাঁচা মরিচ ৬–৭টা।

প্রণালি
চুলায় গরম কড়াইতে তেল ও ঘি দিয়ে তাতে পেঁয়াজ দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে নিন। সব মসলা দিয়ে কিছুক্ষণ কষিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনমতো পানি দিতে হবে মসলা কষানোর সময়। এরপর চিংড়ি দিয়ে ঢেকে দিন। চিংড়ির পানি শুকিয়ে এলে নারকেলের দুধ ও পরিমাণমতো পানি ঢেলে দিতে হবে। পানি শুকিয়ে এলে কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা ছড়িয়ে দিয়ে নামিয়ে নিন।

কলার কাঞ্জল নিরামিষ
উপকরণ
কলার কাঞ্জল (কলাগাছের কাণ্ডের ভেতরের সাদা নলের মতো অংশ) ৫০০ গ্রাম, আলু সেদ্ধ ২টি মাঝারি, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, কাঁচা মরিচ ৭–৮টি (২ টুকরা করা), পাঁচফোড়ন আধা চা-চামচ, তেজপাতা ২টি, ধনেগুঁড়া আধা চা-চামচ, তেল ২ টেবিল চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, লবণ পরিমাণমতো।

প্রণালি
কলার কাঞ্জল কেটে অল্প পানিতে একটু ভাপ দিয়ে নিতে হবে। পানি যদি বেশি হয় ফেলবেন না। আলু সেদ্ধ করে আধা ভাঙা করে রাখতে হবে। এরপর কড়াইতে তেল গরম হলে পাঁচফোড়ন দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই সব মসলা ও কাঁচা মরিচ দিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে অল্প পানি দিয়ে কষিয়ে নিন। এরপর কাঞ্জল, আলু ও পরিমাণমতো পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। পানি শুকিয়ে এলে ঘি দিয়ে নামিয়ে ফেলতে হবে।

সবুজ করলা ভাজি

উপকরণ

করলা ৫০০ গ্রাম, পেঁয়াজ ৪–৫টি মাঝারি লম্বা করে কাটা, কাঁচা মরিচ ৪–৫টি, তেল ও লবণ পরিমাণমতো।

প্রণালি

করলা ধুয়ে পাতলা করে কেটে নিতে হবে। এরপর কড়াইয়ে তেল গরম হলে পেঁয়াজ দিয়ে এক–দুইবার নেড়ে করলা, কাঁচা মরিচ ও লবণ ঢেলে একটা নাড়া দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ২–৩ মিনিট পরে আরও একবার নেড়ে ২ মিনিট বা নিজে বুঝে রং সবুজ থাকতে নামিয়ে বাটিতে বেড়ে ফেলতে হবে।