গ্রাম্য সমাজে শহরের হাতছানি

image_titleশহর ও গ্রামে চাকরিজীবী পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংসারে সুখ আনতে যখন টাকা উপার্জন করা মোক্ষম সময় মনে করে...শহর ও গ্রামে চাকরিজীবী পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংসারে সুখ আনতে যখন টাকা উপার্জন করা মোক্ষম সময় মনে করে পরিবারের অন্য সদস্যদের দিকে তাকানোর ফুসরত সময় নেই। তখন যৌথ পরিবারগুলো একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে কিন্তু সুখপাখি সহজে ধরা দিচ্ছে না।

ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ, শান্তি নামক আদৃশ্যবস্তু অশান্তিতে পরিণত হচ্ছে।গ্রামের বাড়িতে বাবা-মা, দাদা-দাদিসহ অন্য সদস্যদের নিয়ে যে পরিবারগুলো থাকে নানা বিষয়ে কিছু সমস্যা থাকলেও সুখপাখি নিরালায় গান গায়। শিশুদের খেলায় জন্য অবাধ মাঠ, দাদা-দাদির আদরমাখা কোল, মাঠের পর মাঠ, সবুজ ধানের হাসি দোল খাওয়া, মটরশুঁটির ঝুমুর নৃত্য, রাতে ঝিঁঝিপোকার ডাক, মাঝে মাঝে শিয়ালের হুককো হুয়া। সত্যিই অসাধারণ গা শিহরিত সুবাস।ঢাকা শহরে বিষাক্ত সিসা, ডাস্টবিনে জমা আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ, ভয় হয় কখন কী জানি কী হয়। ছোট আদরের বাচ্চাকে কয়েক দিনের পরিচয়ে পরিচিতজনের কাছে রেখে অফিস করা, সারাক্ষণ আতংক বাচ্চাটা কেমন আছে কী করছে মেয়েদের জন্য আরও ভয়ানক বিষয় যৌনতার হাতছানি। সিনিয়র বস, সহকর্মীদের চোখের ভাষা, বিভিন্ন ইঙ্গিত সত্যিই বাজে একটা বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে ভালো পরিবেশও আছে।শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের কোণায় কোণায় গুমড়ে কাঁদার শব্দ শোনা যায়। সভ্যতার আধুনিকতার সঙ্গে চলতে গিয়ে অনেকের জীবন নরক যন্ত্রণায় পর্যবসিত হচ্ছে। তবু থাকে নোঙরামি, উচ্চবিত্তের লালসার জিহ্বা।গ্রামের সহজ-সরল জীবনযাত্রায় এখন কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। বড় বড় বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে, ঘরে এসি লাগানো হচ্ছে, টিভি ফ্রিজ সে তো সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে মানুষ যার জন্য এতো খাটাখাটনি করছে সেই সুখপাখি আবডালেই থেকে যাচ্ছে। নিদারুণ সমস্যাগুলো গ্রাম্য সমাজেও পরিলক্ষিত হচ্ছে।বাংলাদেশে বেশির ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত হচ্ছে।

সমিতির কিস্তির টাকা সংগ্রহ করতে মানুষ আজ দিশেহারা। যার ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে তার কোনো না কোনো এনজিও থেকে টাকা উত্তেলন করা আছে। এই টাকা হাতে আসামাত্র খরচ হয়ে যায়, পরে কিস্তির জন্য আরও এক এনজিও থেকে ঋণ উত্তোলন করা লাগে। এভাবে শহরের হাতছানি গ্রাম্য সমাজব্যব্স্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।কিছুদিন আগেও মানুষের বিনোদনের জন্যে সার্কাস, যাত্রাপালা, পল্লীগীতি আসর, উপভোগ করা যেত। কিন্তু এসব কিছুই আর পরিলক্ষিত হয় না। মানুষের হাতে এখন অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট। একটু টার্সে পৃথিবী হাতের মুঠোই।এখন মোবাইলের মাধ্যমেই কম্পিউটারের অনেক কাজ করা সম্ভব। ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকা লাগে না। মুহূর্তেই আদান-প্রদান মনের লেনদেন। ফেসবুক, টুইটার, গুগল, ইউটিউব, আরও কত কি কী চায় আপনার সব কিছুই হাতের নাগালে। প্রিয়জন বিদেশে। জানালায় বসে, বা রান্না করতে করতে তার মুখছবি আঁকা আর লাগে না, মোবাইলের একটু টার্সে প্রিয়জনের মুখখানি তার কণ্ঠস্বরসহ মোবাইলের স্কিনে ভেসে উঠছে।আজ থানা শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড সহ বড় বড় বিল্ডিং মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। গ্রামের রাস্তা এখন পাকা পিচের রাস্তা। মাটির ঘরবাড়ি পাকা ইটের। বড় বড় ব্যাংক বীমার মাঝেও এখনও সুদে মহাজনী ব্যবসার রমরমা।লাখে ১০ হাজার, ৫ হাজার সুযোগমতো উচ্চসুদ। ক্ষণেকের উপকারে এলেও পরবর্তী সময়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে এসব সুদে কারবারির আচরণে সুদে টাকা নেওয়া মানুষগুলো। আধুনিকতায় গা ভাসিয়ে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের হেয়ারস্টাইল। প্রশাসনের নাকের ডোগায় মাদকের ভয়ানক ছোবল।এখনও বাংলাদেশে ৬১ ভাগ মানুষ গ্রামে বা থানা পর্যায়ে বাস করে। কৃষিপ্রধান দেশে যারা বিদেশে গিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, যারা দেশের চালিকাশক্তি তারাই আজ দিশেহারার স্বপ্নে জর্জরিত। গার্মেন্টসশিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বেশির ভাগ মানুষই এই গ্রাম থেকে প্রেরিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় গ্রাম বা থানাপর্যায়ে এখনও আধুনিক চিকিৎসাসেবা গড়ে উঠেনি। কিন্তু কোচিং বাণিজ্য গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।শহরের হাতছানিতে গ্রাম আজ নিজের আকার ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফসলে জমিতে একের পর এক ইটভাটা, কলকারখানা, বসতঘর তৈরি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় আসন্ন।।