অস্বস্তিতে আওয়ামী লীগ

image_title‘আমেজহীন’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ‘বিব্রত’ আওয়ামী লীগ। নানা ধরনের চেষ্টা ও ছাড়ের পরও ভোটার উপস্থিতি হ্রাসের ঘটনায় অস্বস্তিতে আছে...‘আমেজহীন’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ‘বিব্রত’ আওয়ামী লীগ। নানা ধরনের চেষ্টা ও ছাড়ের পরও ভোটার উপস্থিতি হ্রাসের ঘটনায় অস্বস্তিতে আছে দলটি।প্রকাশ্যে এর জন্য বিএনপিকে দায়ী করলেও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনকে চেনারূপে ফেরানোর পথ খুঁজছেন ক্ষমতাসীনরা।

তবে ভোটার উপস্থিতি কম বলেই যে নির্বাচন থেকে মানুষের আগ্রহ কমে গেছে- এমনটা মানতে নারাজ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। তাদের মতে, উৎসবমুখর ভোট করতে সব রাজনৈতিক দলেরই সদিচ্ছা থাকতে হবে।এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচনে বিএনপিসহ অনেক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।তিনি বলেন, খেলার সময় আমরা যদি আগেই জানি যে ফলাফল কী হবে, তাহলে লোকজনের আগ্রহ একটু কমই থাকবে। এছাড়া দেশে উন্নয়ন যত বেশি হয়, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তত কমে যায়। ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশে ভোট কম পড়ে। ওরা অনলাইনে ভোটের সুবিধা দেয়, রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু তারপরও ৩০ শতাংশ ভোট হয় না। আমরা মনে করি ভোটার উপস্থিতি যাতে আরও বেশি হয়, সেজন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবার সদিচ্ছা থাকতে হবে।একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে সব ভোট বর্জন করছে বিএনপি ও তাদের জোট শরিকরা। ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র পদের উপনির্বাচন এবং উত্তর দক্ষিণের নতুন ওয়ার্ডগুলোর নির্বাচনে বিএনপি আসেনি। সেখানে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থী না দিয়ে উন্মুক্ত রাখে আওয়ামী লীগ। তাতে ওয়ার্ডগুলোতে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বী ও উৎসবমুখর ভোট হলেও মেয়র পদে ভোট জমেনি। এ পদে ভোট পড়ে ৩১.০৫ শতাংশ।এরপর আসে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন।

এ নির্বাচনও বর্জন করে বিএনপি। উপজেলাতেও চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী দিলেও ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখে ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু তাতেও ফেরেনি নির্বাচনী আমেজ।ভোটের আগেই চার ধাপ মিলিয়ে দেড় শতাধিক চেয়ারম্যান ভাইস চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র ৩৩ শতাংশ।একই রকম দৃশ্য দেখা গেছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপেও। ভোটারের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। সারা দিন ভোট কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। ভোটারদের জন্য কেন্দ্রে অপেক্ষায় ছিলেন ভোট সংশ্লিষ্টরা। প্রার্থীরা নানাভাবে ভোটারদের কেন্দ্রে নেয়ার চেষ্টা করেছেন।কিন্তু তাতে তেমন একটা সুফল আসেনি। এই নির্বাচনও অনেকটাই আমেজহীনভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, একতরফা নির্বাচনের কারণে ভোটাররাও কেউ ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নয়। এহেন নির্বাচনবিমুখতা গণতন্ত্রবিমুখতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।এই অবস্থা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে তিনি উল্লেখ করেন। সোমবার বিকালে নির্বাচন ভবনের নিজ কক্ষে সাংবাদিকদের কাছে মাহবুব তালুকদার এসব কথা বলেন।এ বিষয়ে মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আজকে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছে। এই নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছিল বিএনপি। আজকে যারা নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন, তাদের বলব অতীতে ফিরে যান।বিএনপিকে নির্বাচনমুখী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের রায় নিয়ে তাদের জন্য কল্যাণকর কাজ করার চিন্তাভাবনা করুন। এর বাইরে অন্য কোনো পথ ধরলে আপনাদের অবস্থা হবে মুসলিম লীগের মতো। ধীরে ধীরে শুধু রাজনৈতিক সংকটে নয়, অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।এদিকে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বা নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে শুরু থেকেই নানান পরিকল্পনা ছিল আওয়ামী লীগের। নির্বাচনে একাধিক পদ উন্মুক্ত রাখা এবং দলীয় বিদ্রোহীদের ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নিতে দেখা যায়নি দলটিকে।তৃণমূলে নেতাদের উৎসবমুখর ভোট করতে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে বারবার। যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয় সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে কেন্দ্র থেকে। সামনে এই বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে চায় দলটি।দলীয় সূত্র জানায়, আগামীতে কী করলে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়বে তা নিয়ে দলের মধ্যে চলছে নানা বিশ্লেষণ। এ ক্ষেত্রে দল ও সরকারের কী কী করণীয় থাকতে পারে বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। যদিও তা প্রকাশ্যে বলছেন না দলের কোনো নেতা।এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি নির্বাচনটা যেন প্রতিদ্ব ন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। এর জন্য আমাদের তরফ থেকে চেষ্টার কমতি নেই। নানা ধরনের উদ্যোগের কারণেই তৃণমূলে নির্বাচনী ভাবটা আছে। তবে হ্যাঁ, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কমের জন্য আমাদের দায় না থাকলেও অস্বস্তি কিছুটা আছে। কীভাবে এটা কাটানো যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তবে এটাও সত্য কেউ যদি নির্বাচনে না আসে তাহলে কিন্তু তাকে জোর করে নিয়ে আসা যায় না। আমরা আগেও চেষ্টা করেছি ভোট প্রতিদ্ব ন্দ্বিতাপূর্ণ ও উৎসবমূখর করতে, সামনের ধাপগুলোতেও সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।।