বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ৫ রান্না

image_title

মানুষের স্বভাবজাত জায়গা পরিবর্তন প্রক্রিয়া, উপকরণের অপ্রতুলতা, আয়োজনের জটিলতা, জনরুচির পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে অনেক খাবার কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে বা অপ্রচলিত হয়ে গেছে। কিন্তু একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। সেই খাবারগুলো কোনো না কোনোভাবে বেঁচে আছে আমাদের স্বাদস্মৃতিতে। খাদ্যসংস্কৃতির জগতে হারিয়ে যাওয়া খাবারের তালিকা নেহাত ছোট নয়।

খোঁজ করলে বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদে মিলবে সেসব খাবারের নাম আর রন্ধনপ্রণালি। হারিয়ে যাওয়া খাবারগুলোর সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনেক সংস্কার, অনুষ্ঠান, অভ্যাস, অনেক গল্প কিংবা স্মৃতি। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে খাবার সুস্বাদু করার সূক্ষ্ম লোকায়ত জ্ঞান। এই নাগরিক জীবনের বিপুল ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ রেলিংয়ে বসা চড়ুই দেখে আমরা যেমন ফিরে যাই শৈশব-কৈশোরের ধূসর জগতে, তেমনি কখনো কখনো হঠাৎ মনে হয়, আহা, কত দিন ওই খাবারটা খাওয়া হয় না! আটপৌরে হেঁশেল তখন হয়ে ওঠে স্মৃতি হাতড়ানোর জাদুর বাক্স। খোঁজ পড়ে সেই খাবারের রন্ধনপ্রণালির, সেই রাঁধুনির।
অঞ্চল ধরে খুঁজে ফেরা সম্ভব না হলেও আমরা চেষ্টা করেছি কিছু হারিয়ে যাওয়া বা অপ্রচলিত হয়ে যাওয়া খাবারের রন্ধনপ্রণালি খুঁজে বের করার। পাকশালা যাদের জীবনযাপনের অংশ তাদের কাছ থেকে এই রন্ধনপ্রণালিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।

খাবারগুলো নকশার পাঠকদের জন্য রান্না করে দিয়েছেন জেবুন্নেসা বেগম।

পুঁটি মাছের শুঁটকিতে ঝাল কচুশাক
উপকরণ: ডাঁটাসহ কচুশাক আধা কেজি, পুঁটি মাছের শুঁটকি ১ কাপ, থেঁতো করে নেওয়া রসুন আধা কাপ, কাঁচা মরিচ ১০/১২টি, পাঁচফোড়ন আধা চা-চামচ, জিরাবাটা ১ টেবিল চামচ, সয়াবিন তেল ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, ভেজে নেওয়া শুকনো মরিচ ২টি।
প্রণালি: কচুশাক ধুয়ে বেছে ডাঁটাগুলো দেড় ইঞ্চি লম্বা করে এবং শাকগুলো মাঝখানে কেটে নিন। পুঁটি মাছের শুঁটকির পেট পরিষ্কার করে ভালো করে গরম পানিতে ধুয়ে নিন। এবার কড়াইয়ে তেল গরম করে পাঁচফোড়ন ও থেঁতো করা রসুনের কোয়াগুলো এবং শুঁটকিগুলো একসঙ্গে ভালো করে ভেজে নিন। ভাজা হয়ে এলে তাতে মাঝখানে চিরে নেওয়া কাঁচা মরিচ দিয়ে কচুশাক দিয়ে একটু নেড়ে নিন। আগুনের আঁচে শাক কমে এলে লবণ দিয়ে অল্প পরিমাণ পানি দিয়ে ঢেকে দিন এবং চুলার জ্বাল মাঝারি আঁচে রাখুন। শাকের পানি বের হয়ে শাক সেদ্ধ হয়ে এলে জিরাবাটা দিয়ে মিনিট পাঁচেক কষান। কষাতে কষাতে শাক গলে পানি টেনে প্রায় শুকনো হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

নামানোর আগে দুটো ভাজা শুকনো মরিচ শাকের ওপর দিয়ে দিন।
রেসিপি: দেবদ্যুতি রায়

উম-ভাতা
উপকরণ: সেদ্ধ চাল ৫০০ গ্রাম, শুকনো শিমের বিচি ১০০ গ্রাম, কাঁচা বা শুকনো মরিচ ৪/৫টি, বড় পেঁয়াজকুচি ১টা, লবণ স্বাদমতো, হলুদ ১ চা-চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ।
প্রণালি: চাল কড়াইয়ে টেলে ভেজে নিন ঠিক চাল ভাজার মতো। এরপর পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। শিমের বিচিগুলোও তেমনি ভাজুন এবং পানিতে ভেজান। বিচিগুলো ভিজে গেলে ছিলে নিন সুন্দর করে। ভিজিয়ে রাখা চাল ধুয়ে নিন। তাতে পেঁয়াজকুচি, লবণ, হলুদগুঁড়া, কাঁচা মরিচ বা শুকনো মরিচ, শিমের বিচি, ঘি এবং পরিমাণমতো পানি দিয়ে চুলোয় বসিয়ে দিন। চুলোর জ্বাল থাকবে মাঝারি থেকে একটু বেশি। পানি শুকিয়ে আসতে থাকলে চুলার আঁচ কমিয়ে দিন। পাঁচ–ছয় মিনিট পর যখন দেখবেন পানি একেবারেই নেই, তখন নামিয়ে নিন। এরপর গরম-গরম পরিবেশন করুন সুস্বাদু উম-ভাতা।
রেসিপি: হাসনা শামিম চৌধুরী

কচু পাতার খাট্টা
উপকরণ: কচি কচু পাতা ৮/১০টা, শুকনো আমশি ১ মুঠো বা তেঁতুল ক্বাথ আধা কাপ, তেল ২ চা-চামচ, রসুনকুচি ১ চা-চামচ, লাল সরিষা ১ চা-চামচ, শুকনো মরিচ ২টা, লবণ এবং পানি পরিমাণমতো।
প্রণালি: প্রথমে কচু পাতা ধুয়ে ৪ কাপ পানি দিয়ে সেদ্ধ করে ঘুঁটে নিন। আমশি দিলে কচু পাতার সঙ্গেই সেদ্ধ করে নিতে হবে আর তেঁতুল ক্বাথ হলে ঘুঁটে নেবার পর দিতে হবে। মিশ্রণ বেশি ঘন বা বেশি পাতলা করা যাবে না। পরিমাণমতো লবণ নিয়ে একটু ফুটিয়ে নামিয়ে রাখুন। অন্য একটি প্যান বা কড়াইতে তেল গরম করে তাতে শুকনো মরিচ, সরিষা, রসুনকুচি ভেজে কচু পাতার মিশ্রণটি ঢেলে দিয়ে একটু নেড়ে নিন। ভাতের সঙ্গে এই টক স্বাদের কচু পাতার খাট্টা পরিবেশন করুন।
রেসিপি: সুরঞ্জনা মায়া

শজনে দিয়ে ছোলার ডাল
উপকরণ: ছোলার ডাল ২ কাপ, শজনে ৪টি, ঘি ২ টেবিল চামচ, দারুচিনি ৩/৪ টুকরো, সাদা এলাচি ৩/৪টি, লবণ পরিমাণমতো, হলুদ আধা চা-চামচ, তেজপাতা ৩টি এবং পাঁচফোড়ন পরিমাণমতো।
প্রণালি: ছোলার ডাল ধুয়ে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এরপর পরিমাণমতো পানি দিয়ে ডাল সেদ্ধ করে নিন। পানির পরিমাণ এমন রাখুন যেন ডাল সেদ্ধ হওয়ার পরও দুই কাপ আন্দাজে পানি থেকে যায়। ডাল সেদ্ধ করার সময় লবণ আর হলুদ দিয়ে দিন। শজনে তিন ইঞ্চি পরিমাণ লম্বা করে কেটে নিয়ে কড়াইয়ে তেল গরম করে লবণ, হলুদ দিয়ে শজনেগুলোকে হালকা করে ভেজে নিন। এবার আরেকটি কড়াইয়ে ঘি গরম করে তাতে তেজপাতা, পাঁচফোড়ন ও শুকনো মরিচের ফোড়নে সেদ্ধ করে রাখা ডাল বাগাড় দিন। বাগাড় দেওয়া ডালে শজনেগুলো দিয়ে দারুচিনি আর সাদা এলাচি দিন। ডাল ফুটে উঠলে দুই মিনিট পর নামিয়ে পরিবেশন করুন।

রুই মাছের মাথা দিয়ে কলার মোচা
উপকরণ: বিচি কলার মোচা ১টি, মাঝারি আকারের আলু ২টি, ছোট টুকরো করে কেটে নেওয়া রুই মাছের মাথা ১টি, লবণ স্বাদমতো, সয়াবিন তেল ৪ টেবিল চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, জিরাবাটা ১ টেবিল চামচ, দারুচিনি ৩/৪ টুকরো, পাঁচফোড়ন আধা চা-চামচ, পেঁয়াজকুচি আধা কাপ, রসুন থেঁতো করা ৪/৫ কোয়া, কাঁচা মরিচ ৫/৬টি, শুকনো মরিচ ২টি, তেজপাতা ৩টি।
প্রণালি: কলার মোচা ভালো করে ছাড়িয়ে ভেতরের সাদা কেশর বাদ দিয়ে কুচিয়ে নিন। আলু ছোট ছোট চৌকো আকারে কেটে নিন। মাছের মাথা ধুয়ে বেছে লবণ, হলুদ মাখিয়ে নিন। এবার কড়াইয়ে তেল গরম করে মাছের মাথাগুলো কড়া করে ভেজে নিন। সেই তেলে পাঁচফোড়ন, মাঝখানে চিরে দেওয়া তেজপাতা দিয়ে পেঁয়াজকুচি আর থেঁতো করে রাখা রসুনের কোয়াগুলো দিয়ে একটু ভেজে নিন। পেঁয়াজ, রসুন ভাজা ভাজা হয়ে এলে শুকনো মরিচ ফোড়ন দিয়ে তাতে আলু দিয়ে দিন। লবণ, হলুদ, কাঁচা মরিচ ফালি দিয়ে আলু অল্প করে কষিয়ে কুচোনো কলার মোচা দিয়ে দিন। এক কাপ পানি দিয়ে চুলার আঁচ মাঝারি মাত্রায় রেখে ফ্রাই প্যান বা কড়াই ঢেকে দিন। পানি শুকিয়ে এলে ভেজে রাখা মাছের মাথা দিয়ে মিনিট দশেক কষিয়ে নিন। কষানোর সময় অল্প অল্প করে পানি দিতে হবে। এরপর জিরাবাটা আর গোটা দারুচিনি দিয়ে মাখা মাখা করে নামিয়ে নিয়ে ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
রেসিপি: দেবদ্যুতি রায়