বিজেপির সাথে টুইটারের সংঘাত কেন বাড়ছে?

image_titleসোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট টুইটারের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভারতে একটি পার্লামেন্টারি প্যানেলের সমনকে অস্বীকার করার পর তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ওই প্যানেল।
ভারতে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে টুইটারকে তলব করা হলে তারা জানিয়ে দেয়, এত অল্প সময়ের নোটিশে তারা ওই শুনানিতে হাজির হতে পারবে না।
ভারতে শাসক দল বিজেপির সমর্থক বেশ কয়েকটি দক্ষিণপন্থী হ্যান্ডল ব্লকড হওয়ার পরই টুইটারকে জরুরি তলব করেছিলেন ওই পার্লামেন্টারি প্যানেলের প্রধান ও বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর।
এখন ভারতে শাসক দলের সঙ্গে টুইটারের সেই সংঘাত আরও তীব্র আকার নেওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।


ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর টুইটার-প্রীতির কথা সবারই জানা, তার সরকারের মন্ত্রীরাও বিভিন্ন নীতি বা খবর ঘোষণার জন্যও নিয়মিত এই সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমকেই বেছে নিয়ে থাকেন।
অথচ এই টুইটারকেই সোমবার সংসদীয় প্যানেলের শুনানিতে হাজির থাকার নোটিশ পাঠিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর।
কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে আমেরিকা থেকে সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা শুনানিতে আসতে পারবেন না, টুইটার তা জানিয়ে দেওয়ার পর মি ঠাকুর ঘোষণা করেন, তারা বিষয়টিকে মোটেই হালকা ভাবে দেখছেন না - এবং টুইটারের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা খতিয়ে দেখছেন।
দিনকয়েক আগে 'ইয়ুথ ফর সোশ্যাল মিডিয়া ডেমোক্র্যাসি' নামে একটি বিজেপি-সমর্থক গোষ্ঠী টুইটার ইন্ডিয়া কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও দেখিয়েছিল।
তাদের অ্যাকাউন্টগুলো টুইটার বন্ধ করে দিচ্ছে, এই মর্মে তারা পার্লামেন্টারি প্যানেলের কাছে অভিযোগও জানিয়েছিল, আর তার পরই প্যানেলের পক্ষ থেকে টুইটারকে তলব করা হয়।
গুঞ্জা কাপুর নামে একজন দক্ষিণপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট যেমন বলছিলেন, তিনি রামমন্দির নিয়ে তার বানানো একটি ভিডিও টুইটারে পোস্ট করেছিলেন বাবরি মসজিদ ভাঙার বার্ষিকীর ঠিক দুদিন আগে।
কিন্তু তার ফলোয়াররা সেটা কেউ দেখতে পাচ্ছিলেন না।
পরে তিনি জানতে পারেন, বিশেষ ধরনের কিছু অ্যালগরিদম ব্যবহার করে টুইটার যান্ত্রিকভাবে কিছু শব্দ বেছে নিচ্ছে - আর সেগুলো থাকলেই না কি ওই বিশেষ পোস্টটি ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে।
বিজেপি সমর্থকদের অ্যাকাউন্টগুলো টুইটারের তোপের মুখে পড়ছে, এই অভিযোগ ওঠার পর ওই দলটির পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, টুইটার এর কৈফিয়ত না-দিয়ে পার পাবে না।
বিজেপির মুখপাত্র ও এমপি মীনাক্ষী লেখি বলেছেন, "ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় টুইটার কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করতে পারবে না।"
"সংসদ তাদের জবাবদিহি করলে তারা উত্তর দিতে বাধ্য - আর তারা তা উপেক্ষা করলে তার ফলও তাদের ভুগতে হবে।"
প্যানেলের শুনানিতে হাজিরা না-দিলেও টুইটারের গ্লোবাল পাবলিক পলিসির প্রধান কলিন ক্রাওয়েল ভারতে তাদের নীতিমালা নিয়ে একটি ব্লগ এই সপ্তাহান্তেই প্রকাশ করেছেন।
তাতে নির্দিষ্ট কোনও অ্যাকাউন্টের কথা উল্লেখ না-করলেও তিনি দাবি করেছেন ভারতেও টুইটার স্বচ্ছ্বতা ও নিরপেক্ষতার নীতি নিয়েই চলে, আর তারা কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শেও বিশ্বাসী নয়।
ভারতে সেন্টার ফর ইন্টারনেট সোসাইটির অধিকর্তা সুমন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিবিসিকে এই বিতর্ক প্রসঙ্গে বলছিলেন, "আসলে ইউজারের লোকেশন দিয়ে জুরিসডিকশন বুঝতে হবে না কি কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন দিয়ে - এটা ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের একেবারে মৌলিক একটা সমস্যা।"
"কোম্পানিগুলো ব্যাখ্যা দেয় তাদের রেজিস্ট্রেশন কোন দেশে সেটা দিয়ে, আর সরকারগুলো বলার চেষ্টা করে আমার দেশের লোকজন তোমার প্রোডাক্ট ব্যবহার করছে - কাজেই তোমরা আমার কাছে দায়বদ্ধ। ভারতে সরকার বনাম টুইটারেও সেই একই জিনিস ঘটছে।

"
"তবে আমার কাছে যেটা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঠেকছে তা হল ভারতে বর্তমান সরকারের ডিজিটাল সিটিজেন আউটরিচের ক্ষেত্রে টুইটার কিন্তু বিরাট এক হাতিয়ার। এমন কী মন্ত্রীদেরও সবাইকে বলা হয়েছে তাদের টুইটার প্রোফাইল থাকতে হবে ইত্যাদি।"
"কিন্তু সরকার এত নিবিড়ভাবে টুইটার ব্যবহার করার পরও কোম্পানি হিসেবে সেই টুইটারের সঙ্গেই একটা সুসম্পর্ক থাকবে না, কিংবা তাদের রেগুলেট করার দরকার হলেও একটা বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন পর্যন্ত হবে না - সেটাই অবাক করার মতো," বলছিলেন মি চট্টোপাধ্যায়।
ভারতে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল প্রচারের একটা বড় হাতিয়ার - এবার তা আরও অনেক বড় আকার নেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে সেই নির্বাচনের মাত্র দুমাস আগে কার্যত বিজেপি বনাম টুইটারের সংঘাত কী মোড় নেয় সে দিকে অনেকেরই সাগ্রহ নজর থাকবে।