ঝলসানো খাবার

image_title

আমাদের মেট্রোপলিস জীবনে ঝাঁ চকচকে বিভিন্ন অনুষঙ্গের মতো স্বাদবাহারি খাবার কখন যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সে খোঁজ আমরা রাখিনি। কিন্তু ঢাকার মিরপুরের বিহারি লাইন থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার তিপ্পান্ন গলি আর মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকায় রাস্তার দুপাশে গজিয়ে ওঠা সারি সারি রেস্তোরাঁ আমাদের আটপৌরে রান্নাঘর থেকে কিছুটা হলেও যে মুক্তি দিয়েছে, সেটা ভালোই টের পাওয়া যায়। চীনা রেস্তোরাঁর আলো–আঁধারির পরিবেশ থেকে রুফটপ, মামার হোটেল থেকে চকচকে কাচঘেরা খাবারের দোকান সবখানেই দেশি, উপমহাদেশীয়, থাই, চীনা বা ইউরোপীয়, নাগালের মধ্যে থাকা সব ধরনের খাবার চেখে দেখছে মানুষ। প্রতিদিন চলছে নতুন স্বাদের সন্ধান।

মেট্রোপলিস মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে নতুন খাদ্যযাপনে। এই নতুন যাপনের নবতম সংযোজন ঝলসানো স্বাদের খাবার।
ঝলসানো খাবারের ইতিহাস নতুন নয়, বরং আদি। বলা হয়ে থাকে, আগুন আবিষ্কার মানুষকে সবদিক থেকে এগিয়ে দিয়েছে অনেক গুণ। খাবারের ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি। এই আগুন আবিষ্কারের পর কাঁচা খাওয়া মানুষ খাবারকে ঝলসে খেতে শুরু করে বলেই জানা যায়। এই আদিমতম প্রক্রিয়ার একটা ভদ্রস্থ আয়োজন আধুনিক কালের ঝলসানো খাবার—তা সে মাংসই হোক কিংবা মাছ অথবা সবজি।
ঝলসানো খাবারের দুটি তরিকার কথা আমরা জানি। একটি হলো, শূল্যপক্ক মাংস বা সোজা কথায় আমরা যেটাকে সিস বা শিক কাবাব হিসেবে চিনি। অন্যটি মার্কিন ঘরানার বারবিকিউ। দুই ধরনের খাবারের ইতিহাসই অনেক প্রাচীন। কাবাবের বিষয়ে জনপ্রিয় মত হলো, এটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতে এসেছে। কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্যের সূত্র উল্লেখ করে এটাও বলা যায় যে, শূল্যপক্ক মাংস খাবার প্রচলন ভারতবর্ষ তথা আমাদের বাংলা অঞ্চলেও ছিল অনেক আগে থেকে। কাবাব মাংসকেন্দ্রিক খাবার। মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন মসলার মিশ্রণে কাঠ-কয়লার আগুনে ধীরে ধীরে মাংস সেঁকে কাবাব বানানো হয়, সেটা আমরা জানি। শুধু জানি না, এর স্বাস্থ্যগত ব্যাপারটি।

নরেন্দ্রনাথ সেন তাঁর আয়ুর্ব্বেদ সংগ্রহ বইয়ে বলেছেন, ‘ছাগাদির যকৃৎ প্রভৃতি কোমল মাংসে ঘৃত ও লবণ মিশ্রিত করিয়া তাহা শলাকায় গ্রথিত করত ধূমরহিত অগ্নিতে পাক করিবে। ইহাকে পাকবিদগণ শূল্য-মাংস বলিয়া থাকেন। শূল্যমাংস- অমৃততুল্য, রুচিজনক, অগ্নিবর্দ্ধক, লঘু, কফঘ্ন, বায়ুনাশক, বলকারক ও কিঞ্চিৎ পিত্তজনক।’
কাবাব আমাদের অতিপরিচিত খাবার। তাই বরং আজ বারবিকিউ নিয়ে মেতে থাকা যাক। বারবিকিউয়ের ইতিহাস মোটামুটি ৭ লাখ বছরের প্রাচীন! অর্থাৎ যেদিন থেকে মানুষ আগুনে মাংস ঝলসে খেতে শিখেছে সেদিন থেকেই মূলত বারবিকিউয়ের শুরু! নিশ্চিতভাবে, প্রাচীন বারবিকিউ আর মার্কিন ধারার বারবিকিউয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। বারবিকিউ হচ্ছে ক্যারিবীয় রান্নার একটি ধরন, যা স্প্যানিশ অভিযাত্রী এবং স্প্যানিশ কলোনির মাধ্যমে আমেরিকা হয়ে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।
স্প্যানিশ অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস পৃথিবীতে বারবিকিউ ছড়িয়ে দেওয়ার দাবিদার। ১৫ শতকের শেষের দিকে কলম্বাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যবর্তী একটি দ্বীপে প্রথম জাহাজ নোঙর করেন এবং দ্বীপটির নাম দেন ইনসুলা হিসপানা, অর্থাৎ স্পেনের দ্বীপ। এই দ্বীপের অধিবাসীরা তাদের জন্মভূমিকে ডাকত হাইতি নামে। এই হাইতির আদি অধিবাসী টাইনোরা আগুনের পরোক্ষ শিখা ব্যবহার করে ঢিমে আঁচে মাংস রান্নার এক বিশেষ কৌশল জানত। স্প্যানিশরা দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণের পর মাংস রান্নার সেই কৌশল রপ্ত করে। এরপর তারা আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করার সময় টাইনোদের সেই রান্নার কৌশল ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে এই রান্নার কৌশল স্থানীয় অধিবাসীরা রপ্ত করে। এভাবেই স্প্যানিশদের মাধ্যমে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি ছোট্ট দ্বীপের আদি রান্নার কৌশল ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময় এবং মানুষের মন জয় করে বাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়।
মার্কিন জীবনযাপনে ব্যাকইয়ার্ড বা বাড়ির পেছনের খোলা বাগান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্লান্ত সপ্তাহের শেষে বা বিশেষ বিশেষ দিনে এই ব্যাকইয়ার্ডে জমে আমেরিকানদের বারবিকিউয়ের আসর। বাঙালির নগর জীবনে ব্যাকইয়ার্ড না থাকলেও মাথার ওপর ছাদ আছে। আর আটপৌরে রান্নাঘর তো আছেই। বিশেষ দিনে বা কখনো কখনো সপ্তাহের শেষে বা এমনি মন ভালো থাকলে বাঙালির ‘ভালোমন্দ’ খাওয়ার বাই ওঠে। এই বাই ওঠা দিনে কাঠকয়লার আগুন সাজিয়ে শৌখিন বাঙালি এখন বারবিকিউ খেতে শিখেছে। মূলত আমাদের দেশে ফার্মের মুরগির মাংস আর মাছ বারবিকিউয়ের প্রধান উপকরণ এখনো। তবে মেট্রোপলিস শহরে গড়ে ওঠা রংবাহারি রেস্তোরাঁয় বারবিকিউ খেতে গেলে হয়তো গরু বা খাসিও মিলতে পারে—সঙ্গে অন্যান্য অনুষঙ্গ। ‘পানভোজন’ বলতে যা বোঝায় বাঙালির বারবিকিউয়ে তার অর্ধেক উপস্থিত, অর্থাৎ ভোজন আছে, পান নেই।
তরুণ প্রজন্মের কাছে ইদানীং ভ্রমণ বেশ জনপ্রিয় ব্যাপার হয়ে দেখা দিয়েছে। দল বেঁধে ঘুরতে গিয়ে রিসোর্টের পাশে আগুন জ্বালিয়ে গিটারের টুংটাং মাদকতায় উদাত্ত কণ্ঠের গান আর সঙ্গে বারবিকিউ করার যে আনন্দ, তরুণেরা তাতে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। রিসোর্ট বা ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে একটু খুঁজলেই বারবিকিউয়ের উপকরণ মিলে যায়। বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ির ছাদেও এভাবেই বারবিকিউ করার রেওয়াজ শুরু হয়েছে তরুণদের মধ্যে। বারবিকিউ এখনো তাই তরুণদের প্যাশনের মধ্যেই আবদ্ধ। পারিবারিক আয়োজনও হয় তরুণদের নেতৃত্বে। এসব কিছু এখনো ছাড়া ছাড়া। সরষের তেলে মুড়ি–চানাচুর মেখে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বাঙালির চিরকালীন আড্ডার যে বাতাবরণ, সেখানে বারবিকিউ এখনো প্রবেশ করতে পারেনি সম্ভবত আয়োজনের ঝক্কির কারণে। তবে বাজারে এখন সহজেই কিনতে পাওয়া যায় বারবিকিউ মেশিন—বিভিন্ন আকারের, হরেক রকমের।
তবে হ্যাঁ, বাঙালি প্রতিদিনই বারবিকিউ খায়! রাস্তার দুপাশে সার দেওয়া রেস্তোরাঁর বাইরে স্টিলের তৈরি খাঁচায় গ্যাসের নীলচে আগুনের শিখায় পুড়তে থাকা মুরগি, আমরা যাকে চিনি ‘গ্রিলড চিকেন’ হিসেবে, সেটাও বারবিকিউ। এই গ্রিলড চিকেন, সঙ্গে তন্দুরী রুটি আর মেয়নেজ গত এক দশকে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এখানে। বলতে গেলে এটি এখন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাপনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাদযাপনে অভ্যস্ত বাঙালি মওকা পেলেই স্বাদ খুঁজে নেবে এটাই স্বাভাবিক। ঝলসানো মাংসের স্বাদ সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটা নতুন ঢেউ তুলেছে। সে ঢেউয়ে পাল তুলে আমরা বলতে শিখেছি, আহো, জীবন মধুময়!

লেখক: লোকসংস্কৃতি গবেষক