ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ: মতামতের অপেক্ষায় কমিটি

image_title২০১৩ সালের মধ্যে টিএফএ র ব্যবহার নির্মূল অর্থাৎ ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জন্য গঠিত এই কমিটির কাজ করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে কিছুটা পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২ লাখ ৭৭ হাজারসহ বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটি ৭৯ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যান। আর তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সয়াবিন, পামওয়েলের সঙ্গে হাইড্রোজেন দিয়ে জমাট করে বনস্পতি যা ডালডা নামে পরিচিত বানানো হয়, এই ডালডায় ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ ট্রান্সফ্যাট থাকে।

সাধারণত খরচ কমানোর জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, জিলিপি, চিকেন ফ্রাইসহ বিভিন্ন ভাজা পোড়া খাবার তৈরির সময় এসব ব্যবহার করা হয়ে থাকে।]বাংলাদেশের মানুষ গড়ে কী পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ করে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য না থাকলেও সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা ঢাকার স্থানীয় বাজার থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে সংগৃহীত ১২ ধরনের বেকারি বিস্কুট নিয়ে গবেষণা করে এসব নমুনা বিস্কুটগুলোতে ৫ শতাংশ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্স ফ্যাটের উপস্থিতি পেয়েছে।গ্লোবাল হেলথ এডভোকেসি ইনকিউবেটরের আবাসিক সমন্বয়ক মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস সম্প্রতি এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা না গেলে বাংলাদেশ থেকে এখন যে খাদ্যপণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়, তা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ।এদিকে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা কার্যকরে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। যেই কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ।তিনি শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ২০২৩ সালের মধ্যে টিএফএ র ব্যবহার ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তারা কাজ শুরু করেছেন। এরই মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েকটি বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত প্রয়োজন। মতামত পেলেই তারা পরের ধাপে যাবেন।ডালডায় ভাজা এইসব খাবার ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যের জন্যডালডায় ভাজা এইসব খাবার ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যের জন্যটেকনিক্যাল কমিটির অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) র সহকারী পরিচালক (কৃষি ও খাদ্য- মান উইং) এনামুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের শতকরা প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বনস্পতি বা ডালডার মাধ্যমে। এসব ডালডা বেকারিতে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। বাকি ২০ ভাগ আসে প্রাকৃতিকভাবে।বর্তমানে ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রায় এসব ডালডা গলার বিষয়ে বিএসটিআই র অনুমোদন আছে। এটাকে ৪৫ থেকে আরও উপরে নিয়ে যেতে পারাটাই এখন লক্ষ্য।সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠন করা টেকনিক্যাল কমিটি এনিয়ে কাজ করছে জানিয়ে এনামুল বলেন, এটার বাস্তবায়ন হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাট শতকরা ২ভাগে কমিয়ে আনা সম্ভব।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, ট্রান্স ফ্যাটের তুলনায় প্রাকৃতিকভাবে তৈরী হওয়া গরু, ছাগলের মাংস, দুগ্ধজাত খাবার থেকে তৈরি হওয়া ঘি, মাখন (সলিড বা অসম্পৃক্ত) তুলনামূলক ভালো। তারপরেও ঝুঁকি আছে।তিনি জানান, ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা ২ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনতে হলে বর্তমান যে প্রযুক্তি আছে তার মাধ্যমে হাইড্রোজেনেশন (পাম, সয়াবিনের সাথে হাইড্রোজেন যুক্ত করলে তেল জমে যায় যা ডালডা নামে পরিচিত- যা ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস) বন্ধ করে সলিড ফ্যাট যুক্ত করে বাজারজাত করার বিষয়েও বৈঠকে আালোচনা হয়েছে। হাইড্রোজেনেশন বন্ধ করে সলিড ফ্যাট যুক্ত করার পাশপাশি ট্রান্স ফ্যাটের (বিএসটিআইয়ের বর্তমান নির্ধারিত তাপমাত্রার ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করার নির্দেশ বিএসটিআইকে দিলে জনস্বাস্থ্যের জন্য আর কোনো ‍ঝুঁকি আছে কি না বা কতটুকু ঝুঁকি আছে তা যাচাই করা প্রয়োজন। এরবাইরেও উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় সেসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে মেশিনারিজসহ কাঁচামালের কিছু পরিবর্তন আনতে হবে।আর এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, হার্ট ফাউন্ডেশন, হৃদরোগ ইন্সটিটিউট, পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের মতামতের প্রয়োজন রযেছে। এদের মতামতের জন্য কমিটির পক্ষ থেকে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ মতামত আসার পর পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে কাজের গতি কিছুটা পিছিয়ে গেলেও ২০১৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাট ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ সম্ভব হবে। ।