সময়ের তাগিদে স্কুটি

image_titleএকসময় স্কুটি বা স্কুটারকে বলা হত মেয়েদের উপযোগী বাইক। স্কুটির বিজ্ঞাপন চিত্রেও নারীদের সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে একসময়। তবে সময়ের তালে এই দুই চাকার বাহন এখন নারী-পুরুষ সবাই ক্ষেত্রেই ব্যবহার বেড়েছে।জ্বালানি সাশ্রয়ী, অন্যান্য মটরসাইকেল চালানোর থেকে তুলনামূলক সহজ, পায়ের সামনে বেশ খানিকটা জায়গা খালি থাকে বলে জিনিসপত্র আরামে নেওয়া যায়- এরকম বিভিন্ন কারণে স্কুটি ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে করেন তেঁজগাওতে অবস্থিত টিভিএস য়ের বিপণন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম।

তথাকথিত পুরুষালী মোটরসাইকেলের সঙ্গে স্কুটারের কয়েকটি পার্থক্য আছে। যেমন স্কুটারের ইঞ্জিন ও তেলের ট্যাঙ্কি পেছনে হওয়ায় সামনের অংশটা ফাঁকা থাকে। ফলে তাতে উঠে বসা তুলনামুলকভাবে সহজ। বেশিরভাগ স্কুটারে কোনো গিয়ার শিফ্টিং য়ের ঝামেলা থাকে না, অটো-ট্রান্সমিশন , যা চালকের সুবিধা বাড়িয়ে দেয়। আবার ওজনের দিক থেকেও স্কুটার তুলনামূলক হালকা।রাশেদুল ইসলাম বলেন, স্কুটারের চাহিদা বাংলাদেশের বাজারে বরাবরই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছিল। তবে একটি স্কুটার তৈরি করতে যে সময় প্রয়োজন হয় সেই সময়ে একাধিক সাধারণ মোটরসাইকেল তৈরি সম্ভব। আর একারণেই স্কুটার সরবরাহে ঘাটতি। সম্প্রতি স্কুটার বিক্রির হার ও চাহিদা আরও বেড়েছে, যা চার-পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় পাঁচগুন। নারীর তুলনায় পুরুষ ক্রেতাই বেশি, আর তাদের বেশিরভাগই অভিজাত শ্রেণির মানুষ যাদের নিজেদের গাড়িও আছে।রাশেদুল জানান, ক্রেতাদের মতে- স্কুটার চালানো সহজ, এমনকি যারা কখনই মোটসাইকেল চালাননি তারাও সহজে কৌশলটি রপ্ত করতে পারেন স্কুটারের মাধ্যমে। ক্লাচ আর গিয়ার না থাকাটাই কাজটা সহজ হওয়ার মূল কারণ বলে দাবি করেন এই ক্রেতারা। এছাড়াও বৃষ্টির দিনে রাস্তার কাদা ছিটে আসা থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেয় এই স্কুটার। নারী ক্রেতাদের ক্ষেত্রেও এই সুবিধাগুলো প্রযোজ্য।এবার আসা যাক একজন ব্যবহারকারীর প্রেক্ষাপটে। প্রায় আড়াই বছর ঢাকার রাস্তায় স্কুটার চালিয়ে অফিস যাতায়াত করেন গাজি টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার শমী ইব্রাহিম।

সকাল বেলা সন্তানকে স্কুলেও পৌঁছে দেন এই স্কুটারে করেই।তিনি বলেন, স্কুটার চালনোর হাতেখড়ি হয় আমার স্বামীর হাতে, যার নিজের মোটরসাইকেল থাকার পরেও স্কুটারেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সুবিধার কথা বলতে গেলে স্কুটারে তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম, বৃষ্টিতে চালালেও মোটেই গায়ে কাদা উঠে না, ওজন কম হওয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সুবিধা হয়, পানিতে ভিজলেও স্টার্ট না হওয়া বা অন্যান্য সমস্যা কম হয়, ক্লাচ ও গিয়ার নাই বলে চালানো অনেক আরামদায়ক। একটি বড় সুবিধা হল এর সিটের নিচে জিনিসপত্র রাখার জায়গাটুকু। তালা-চাবির ব্যবস্থা থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, এমনকি টাকা পয়সাও এর মধ্যে রেখে আরামে চলাফেরা করতে পারি। স্কুটার চালানো দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে শমী ইব্রাহিম বলেন, বাজে অভিজ্ঞতার পরিমাণ খুবই কম। অনেকেই ধারণা করেন রাস্তায় থাকা বাস, সিএনজি ইত্যাদি বড় যানবাহনের পাশ কাটানো ভীতিকর হবে, তারা সুযোগ দেবে না অতিক্রম করার, দুর্ঘটনা ঘটবে। তবে আমি বরং তাদের কাছ থেকেই বেশিরভাগ সময় ভালো ব্যবহার পেয়েছি। রিক্সা বেশ সমস্যা তৈরি করে ঠিক, তবে তাদের কাণ্ডজ্ঞানের মাত্রার হিসেব করে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতেই দেখি। তবে মাত্রায় কম হলেও অন্যান্য মোটরসাইকেল চালকদের মাঝে চলার পথে পাল্লা দেওয়া প্রবণতাটা ভোগায়। হাতে গোনা কিছু মানুষের নারী চালকদের কাছে নিজেকে দক্ষ চালক হিসেবে প্রমাণ করা, শুধু মেয়ে বলে আমাকে সাইড দেবে না এমন প্রবণতা দেখি, কেউ কেউ বাজে ব্যবহারও করেন। তিনি আরও বলেন, তবে ভালোর দিকই বেশি, অনেকেই নিজে সরে গিয়ে আমাকে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেন যা হয়ত পুরুষ চালকের ক্ষেত্রে নাও করতে পারতেন। আর এখন নারীদের স্কুটার চালানোর মাত্রা যেমন বেড়েছে তেমনি সর্বস্তরের মানুষও বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। আজকাল যখন দেখি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ য়ের মাধ্যমে একজন পুরুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন একজন নারী তখন খুব ভালোলাগে। তো একজন স্কুটার ব্যবহারকারী পুরুষ মনোভাব কেমন এই বিষয়ে? তা জানার জন্য আলাপ করা হয় এটিএন বাংলার আলোকচিত্রি মোহাম্মদ সোহেল রানার সঙ্গে।তিনি বলেন, স্কুটার শুধু মেয়েদের বাহন এই ধারণা শুধু আমাদের দেশের মানুষই আকড়ে ধরে পড়ে আছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতেই পুরুষরা স্কুটার চালাচ্ছেন বুক ফুলিয়ে, যেখানে তাদের দেশে মোটরসাইকেলের দাম আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম। আমি যখন স্কুটার কিনি তখন আমাকেও অনেকেই বলেছেন, আপনি পুরুষ মানুষ কেনো স্কুটার কিনতে গেলেন? কেউ কেউ মশকরাও করেছেন। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে আমি স্কুটার কিনেছি স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা করেই। যাটজটের রাস্তায় মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে ক্লাচ টানতে টানতে হাত ব্যথা হয়ে যায়, গিয়ার ওঠানামা করতে গিয়ে জুতা নষ্ট হয়, গিয়ারের ওঠানামা হিসেব মতো না হলে রাস্তার মাঝে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বৃষ্টির দিনে কাদা উঠে প্যান্টের নিচের অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এক স্কুটার এই সবগুলো সমস্যা সমাধান করে দিয়েছে। স্কুটির সিটের নিচের জায়গাটুকুর উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। কোথাও মোটরসাইকেল রেখে যাওয়ার সময় হেলমেটে তো আর তালা মারতে পারি না, ফলে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হতো। স্কুটার আমার সেই দুশ্চিন্তাও দূর করে দিয়েছে। বাজার করে বাড়ি ফেরার পথে এই জায়গাটুকুকে নিজের পরম বন্ধু মনে হয়। এসব সুবিধার জন্যই হয়ত দেশে স্কুটির ব্যবহার বেড়ে চলেছে। আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই বাহন শুধু নারীবান্ধব নয় বরং সকল মানুষের সুবিধার বাহন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।।