আসামের নাগরিক তালিকা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। খোদ ভারতেই এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নীরবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ।

এ নিয়ে ভারতের শাসক দল বিজেপি বা আসাম রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা যে বক্তব্যই দেন না কেন তার প্রতিক্রিয়া দেখাবে না ঢাকা। বাংলাদেশের বিদেশ নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা বলছেন, এনআরসি নিয়ে  ভারতের বিদেশমন্ত্রী ঢাকাকে উদ্বিগ্ন না হওয়ায় যে বার্তা দিয়েছেন তাতে ভরসা রাখছে বাংলাদেশ। যদিও আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মার একটি বক্তব্য বিপুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। নাগরিক তালিকা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে বলা হবে তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে। ওদিকে, জাতিসংঘের তরফে আসাম পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কোন মানুষকেই রাষ্ট্রহীন করা যাবে না। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ভারতকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, আসামে একজন ব্যক্তিও রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়বেন না এবং তাঁদের পুরো প্রক্রিয়ায় তথ্যগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রেক্ষিতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক অবশ্য একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের নাগরিক অধিকার রক্ষা করা হবে। এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ বা অস্বস্তি কেন? আসামে নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়- শুরু থেকেই ঢাকা এটি বলে আসছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এটিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলার পরও বাংলাদেশে এ নিয়ে উদ্বেগ বা অস্বস্তি কেন? জবাবে ঢাকার কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা যেটা বলার চেষ্টা করেন তা হলো- দেশটির শাসক দলের তরফে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে তাতে এনআরসির দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে যারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে প্রমাণে ব্যর্থ হবেন তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এজন্য তারা আগেবাগেই নাকী বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলবে। উদ্বেগের বিষয়টি এখানেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসীনের মতে বাংলাদেশের এখনই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার আর প্রস্তুতি নেয়ার দরকার আছে। তিনি মনে করেন- আইন-আদালতের পর্যালোচনায় এনআরসির বাদ পড়াদের সংখ্যা হয়ত আরও কমে আসবে। কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে।

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যে ঘটনা ঘটে গেছে, সেরকম পরিস্থিতি যাতে আর তৈরি না নয়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের সতর্ক থাকা উচিত। বিবিসি বাংলাকে এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বলেন, ওরা এদের বাংলাদেশি বলার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের পরিষ্কার করে বলা উচিত যে, এরা বাংলাদেশি নয়, এদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন ধরণের দায়িত্ব নেবে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই বার্তাটা এখনই পরিষ্কার করে দেয়া উচিত। কূটনীতিক হুমাযুন কবির মনে করেন, এখনই বাংলাদেশের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ যেভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তালিকায় বাদ পড়াদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে, তাতে ভবিষ্যতে এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পরে। তার মতে, রাজনৈতিক বক্তব্য যা-ই হোক না কেন? এ ধরণের ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় একটি বিষয়ও থাকে। সেখানেই বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। এটা যেন সেই পর্যায়ে না গড়ায়। এজন্য এখন থেকেই বক্তব্য তুলে ধরতে হবে। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের ফেরতনিতে বলা হবে বাংলাদেশকেআসামের এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কথা বলা হবে বলে জানিয়েছেন আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি ভারতের অনলাইন সংবাদ মাধ্যম নিউজ ১৮ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবো ও বলবো তাদের এসব লোককে ফিরিয়ে নিতে। যতদিন এসব মানুষকে ফেরত নেয়া না হচ্ছে, ততদিন তাদেরকে আমরা ভোটাধিকার দেবো না। এক্ষেত্রে তারা বিশেষ কিছু সুযোগ সুবিধা পাবে। হিমান্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ভারতের বন্ধু বাংলাদেশ সরকার। তারা আমাদের সহযোগিতা করছে। এনআরসি তালিকায় নাম না থাকা মানুষদের ফেরত পাঠাতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তিনি বলেন, এনআরসি তালিকায় নাম নেই মানে এটা নয় যে তাদের বিদেশি আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। তাদের ব্যাপারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কিন্তু তত দিন পর্যন্ত ভারতের কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে তাদের অংশ নিতে দেয়া হবে না।’উল্লেখ্য, আসামে অবৈধ অভিবাসী শনাক্তকরণের জন্য প্রণীত এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয় শনিবার। ওই তালিকায় চূড়ান্তভাবে ঠাঁই হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ মানুষের। বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগের দিন শুক্রবার আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল রাজ্যের মানুষদের শান্ত থাকার আবেদন জানান। তিনি বলেন, কেউ যেন আতঙ্কগ্রস্ত না হন। যাদের নাম তালিকায় থাকবে না, তারা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে (এফটি) আবেদন জানাতে পারবেন। মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, নাগরিকত্ব প্রমাণে সরকার তাদের সব রকমের সহায়তা দেবে।আসামের এনআরসি একটি সংবিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) প্রক্রিয়া একটি সংবিধিবদ্ধ, স্বচ্ছ ও বৈধ প্রক্রিয়া। সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে এই প্রক্রিয়া সমপন্ন হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি বৈষম্যহীন ও এতে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার বা অবিচার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবিশ কুমার রবিবার এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছেন। এ খবর দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আসামের নাগরিক পঞ্জীকরণে যাদের নাম বাদ পড়েছে তাদের এখনই বিতাড়িত করা হবে না। তাদের রাষ্ট্রহীন ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং নিজেদের তালিকাভুক্ত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সেসব প্রক্রিয়ায় সকলকেই সাহায্য করবে ভারত সরকার। রবিশ বলেন, এনআরসিতে যাদের নাম নেই, তাদের এখনই আটক করা হবে না। তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। তাদের প্রত্যেককে আইনি সহায়তা দেয়া হবে। এনআরসিতে নাম নেই মানে তারা রাষ্ট্রহীন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।প্রসঙ্গত, শনিবার আসামের এনআরসি’র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে নাম নেই ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনের। তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির ভাতিজা, প্রাক্তন বিধায়ক। এমনকি তালিকায় নাম নেই বহু রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি প্রাক্তন আমলাকর্মীরও। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তালিকায় বাবার নাম থাকলেও, বাদ পড়েছে ছেলে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, নাগরিক পঞ্জীকরণ প্রক্রিয়ায় যারা নিজেদের নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ কী? তাদের বিতাড়িত করা হবে কিনা? আটক করা হবে কিনা? রোববারের বিবৃতিতে এসব প্রশ্নের উত্তরই দিয়েছেন রবিশ। এদিকে, আসাম সরকার জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা দেবে রাজ্য সরকার। চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়াদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে রবিশ জানান, যাদের নাম নেই তারা ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করতে পারেন। তবে আবেদন করতে হবে ১২০ দিনের মধ্যে। সব আবেদনেরই তদন্ত করা হবে। আবেদনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপরও ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে কেউ সন্তুষ্ট না হলে তিনি আসামের হাইকোর্টে আবেদন করতে পারেন। সেখানেও কাঙ্ক্ষিত রায় না পেলে তার অধিকার থাকবে শীর্ষ আদালতে আবেদন করার।রবিশ রোববার বলেন, ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, সরকার স্রেফ তা পালন করেছে। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া কোনো নির্দিষ্ট শাসক পরিচালিত নয়। গোটা প্রক্রিয়ায় নজরদারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট এবং সরকার কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ীই প্রক্রিয়াটি সমপন্ন হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টই প্রক্রিয়ার জন্য দিনক্ষণ বেঁধে দিয়েছেন।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরো বলেন, আসামের মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়েই ভারত সরকার ১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ভারত সরকার, আসাম সরকার, আসাম ছাত্র ইউনিয়ন ও অসম গণপরিষদের মধ্যে স্বাক্ষর হওয়া এই চুক্তি কার্যকর করার অন্যতম একটি পদক্ষেপ এনআরসি। আসাম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে আওয়ামী লীগ আসাম পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মার দেয়া বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে চান না উল্লেখ করে মতিন খসরু বলেন, আসামের অর্থমন্ত্রী বলছেন ফেরত পাঠানো হবে,পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন এটা ঠিক নয়। আমরা মনে করি এটি সম্পূর্ণভাবে তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়। এখনই আমরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। সম্পূর্ণ বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। সোমবার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আসন্ন চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগের ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ৮ দিনের সফরে চীন যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল মতিন খসরু বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন চাইলেই সমাধান সম্ভব। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি যে বক্তব্য দেবে-সেটাই তাদের সরকারের বক্তব্য। চীন সফরে আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তাদের যথাযথ ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ করব। যেন রোহিঙ্গারা সসম্মানে নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে আমাদের জনসংখ্যা মাত্র ৪ লাখ, সেখানে রোহিঙ্গারা এসে রয়েছে ১১ লাখ। তাদের কারণে আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। চীন যদি যথাযথ ভূমিকা পালন করে তাহলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সহজ হবে।।