‘সাহেব বাড়িতে’ ঢাকাই খাবার

image_title

আর্মেনীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত দেড় শ বছরের বেশি বয়সী বাড়িটি পাড়ার লোকের কাছে পরিচিত ‘সাহেব বাড়ি’ নামে। অনেকে বলেন ‘জমিদার বাড়ি’।  ইতিহাস আর ঐতিহ্যের উপকরণ ছড়ানো এই বাড়ির লোকেদের আতিথেয়তার সুনাম বহু যুগের। সেই ধারাবাহিকতায় ঐতিহ্য দর্শনের সুযোগ আর পারিবারিক আবহে রকমারি ঢাকাই খাবারের স্বাদ দিতে বাড়ির একাংশে চালু হয়েছে ব্যতিক্রমী এক রেস্তোরাঁ।

নাম ‘ইমরান’স হেরিটেজ হোম’।

পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়িতে উনিশ শতকের মাঝামাঝি ছয় বিঘা জমির ওপর বাড়িটি তৈরি করেছিলেন ঢাকা ও সোনারগাঁয়ের তৎকালীন জমিদার মৌলভি আবুল খায়রাত মোহাম্মদ। আবুল খায়রাতের দুই ছেলে আবুল হাসনাত ও আবু জাফর জিয়াউল হক ওরফে নাবালক মিয়া। তাঁদের নামেই এই বাড়ির আশপাশের চারটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। এমনই একটি সড়কের নাম নাবালক মিয়া লেন। সাহেব বাড়ির অবস্থান এই লেনের শেষ মাথায়। বাড়িটির দুটি অংশ—বাহিরমহল ও অন্দরমহল।

গত শতকের পঞ্চাশ কিংবা ষাটের দশকে দুই মহলের সামনের প্রশস্ত বাগানের মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের সদস্যরা দেয়াল তুলে বাহিরমহল ও অন্দরমহলকে আলাদা করেন। বর্তমানে বাহিরমহলের নাবালক মিয়ার নাতি এ এম ইমরান। অন্দরমহলে বসবাসরত আবুল হাসনাতের বংশধরেরা সম্প্রতি তাঁদের অংশের পুরোনো স্থাপনা ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করলেও এ এম ইমরান সেই পথ মাড়াননি; বরং প্রাচীন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং বিকল্প কিছু করার অভিপ্রায় থেকে চালু করেছেন চমকপ্রদ এই রেস্তোরাঁ।

গত বৃহস্পতিবার ইমরানের মালিকানাধীন বাহিরমহলে গিয়ে চোখে পড়ে কাচের কারুকাজ করা নকশাদার স্তম্ভ, উঁচু সিলিংয়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বড় বড় দরজা-জানালা, নকশাদার রেলিং। বিশাল হলরুমে সাজিয়ে রাখা শতবর্ষী আসবাব। সেখানে শোভা বাড়াচ্ছে তুরস্ক থেকে আনা পুরোনো ঝাড়বাতি। সোনার প্রলেপ দেওয়া দুই শ বছরের পুরোনো পবিত্র কোরআন শরিফ, মরচে পড়া তলোয়ার, হাতে লেখা ফারসি পুস্তক, পৃথিবীর নানা দেশ থেকে সংগ্রহ করা আতরদানি, দুষ্প্রাপ্য সব ছবি ও শিল্পকর্মসহ নানা উপকরণ বাড়িটির ঐহিত্যের জানা দিচ্ছে। পাশেই খাবার ঘর। ভবনের পরের অংশটুকু নতুন করে বানানো।

কথায় কথায় জানা গেল, একসময় এই বাড়িতেই আতিথেয়তা নিয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী এস এম সুলতানসহ অবিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা। পঞ্চাশের দশকে যুক্তফ্রন্টের বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয় এই বাড়িতে। আলোকচিত্রী ওয়াকার এ খান সংকলিত ‘রেয়ার ফটোগ্রাফস অব ইস্টার্ন বেঙ্গল’–এর অনেক আলোকচিত্রে এবাড়ি-ওবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে তৎকালীন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির ছবি দেখা যায়।

কালের নানা ঘটনার সাক্ষী সাহেব বাড়ির এই অংশকে রেস্তোরাঁয় রূপ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে এ এম ইমরান বলেন, ‘মূলত সৌন্দর্য, আতিথেয়তা ও বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের আনাগোনার কারণে আমাদের এই বাড়ি বিখ্যাত হয়েছিল। রেস্তোরাঁ চালুর আগে এখানে অনেক দেশের কূটনীতিকেরা এসেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা এই বাড়ি এখনো দেখতে আসেন। তাই অনেক ব্যক্তি ও স্থাপত্য নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাকে পরামর্শ দেওয়া হয় এমন ধরনের কিছু একটা করার, যাতে কিছু আয়ের পাশাপাশি ভবনের ইতিহাসটাকেও ধরে রাখা যায়।’

তবে এটাকে প্রথাগত কোনো রেস্তোরাঁ বলতে নারাজ ইমরান। তাঁর মতে, ইতিহাস–ঐতিহ্যের প্রতি যাঁদের আলাদা টান আছে, তাঁরাই মূলত এখানকার ভোক্তা। দর্শনার্থীরা এখানে আসেন, সবকিছু ঘুরে দেখেন আর পরিবারের সদস্যদের রান্না করা খাবার পারিবারিক প্রতিবেশে উপভোগ করেন। এখানে বাণিজ্যিক ব্যাপারটা মুখ্য নয়।

গতকাল ইমরানের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে দর্শনার্থী হিসেবে হাজির ছিলেন পর্যটন খাতের প্রতিষ্ঠান এক্সিলেন্স এশিয়া লিমিটেড ও হলিডেজ ডট কমের দুই স্বত্বাধিকারী এ বি সিদ্দিক ও মো. হাফিজুর রহমান খান। এ বি সিদ্দিক বলেন, ‘আমার ধারণা, কোনো ঐতিহ্যবাহী ভবনকে কেন্দ্র করে এমন উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রথম। এখানে এসে ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার মিশেলে যে চমৎকার অভিজ্ঞতা হলো, তা আমরা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

এদিন দুপুরে অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা খাবারের তালিকায় ছিল জাফরানি পোলাও, ডিমের শাহি কোরমা, আনারস ইলিশ, মুরগির মাংসের চপ, কাঁচকলার চপ, মুরগির রোস্ট, সালাদ এবং ঘরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বানানো বোরহানি। ইমরান জানান, রাতের অতিথিদের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত থাকবে। এই বাড়িতে এক দিনে একই মেন্যু দুবার পরিবেশনের রেওয়াজ নেই।

এই রেস্তোরাঁয় খেতে হলে যোগাযোগ করতে হবে ন্যূনতম তিন দিন আগে। সর্বনিম্ন পাঁচজন ও সর্বোচ্চ ২০ জনের একটা দলের জন্য দুপুর অথবা রাতের খাবারের ফরমাশ করা যাবে। ফরমাশের জন্য Lunch at Emran’s Heritage Home ফেসবুক পেজে যেতে হবে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলন করা সংগঠন আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইমরান আমাদের সামনে একটা উদাহরণ তৈরি করতে পেরেছেন। পুরোনো ভবন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক। তাই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আরও কিছু ভবন যদি এমন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়, তাহলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি ভবনমালিকদের আয়ের একটা পথও তৈরি হবে।’