গুপ্তচর ও মসলার গল্প

image_title

ফায়ারিং স্কোয়াডের সৈন্যদের দিকে মৃত্যুর ঠিক আগে উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দেওয়া মাতা হারির কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। সেই মাতা হারি, যিনি ছিলেন জাতে ডাচ এবং পেশায় নর্তকী। মাত্র ১৮ বছর বয়সে একজন ডাচ সামরিক কর্মকর্তাকে বিয়ে করে মাতা হারি চলে এসেছিলেন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে। এরপর ভাগ্যের বেকায়দা বিদ্রোহে স্বামী, সংসার, সন্তান ছেড়ে পাড়ি জমান প্যারিসে।

সেখানে ব্যাপক ক্ষমতা আর বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার পরেও তাঁর বিরুদ্ধে জার্মানদের পক্ষে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’র অভিযোগ উঠেছিল এবং মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল তাঁর।

মাতা হারির মতোই দুজন গুপ্তচর পর্তুগিজ ও ডাচদের পুরো ইউরোপে মসলার বাণিজ্য করার সুযোগ এনে দিয়েছিলেন। তাঁদের একজনের নাম পেরো দা কোভিলহাম (পেদ্রো দা কোভিল), জাতে পর্তুগিজ। অন্যজন জাতে ডাচ, নাম কর্নেলিয়াস দা হাউটম্যান। কোভিলহামের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দশ বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে পর্তুগিজরা জাহাজ ভাসিয়েছিল ভারতের উদ্দেশে। তার মোটামুটি শ খানেক বছর পর ডাচরা কর্নেলিয়াস দা হাউটম্যান নামে একজন গুপ্তচরকে পাঠিয়ে পর্তুগিজদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভাগিয়ে এনে ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে জাহাজ ভাসিয়েছিল। এরপর অচিরেই পর্তুগিজদের হটিয়ে দিয়ে ইন্দোনেশিয়া দখল করে সেখানে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য কায়েম করেছিল। মসলার বাণিজ্য সূত্রে তৈরি হওয়া ডাচ কলোনির সুবাদেই মাতা হারি ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে এসে সংসার পেতেছিলেন।

প্রথমে পর্তুগিজদের কথা বলা যাক। কারণ, এরাই প্রথম মসলার বাণিজ্য করতে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় এসেছিল। পেরো দা কোভিলহাম ভারতে আসেন ১৪৮৮ সালে। সে সময় ভারতের মালাবার উপকূল ছিল সমৃদ্ধ এক অঞ্চল। মসলার ব্যবসার সুবাদে মালাবারের কালিকট বন্দরের নাম প্রায় পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। পর্তুগিজরাও জানত সে খবর। মসলার লাভজনক ব্যবসা করতে মরিয়া ছিলেন পর্তুগিজ রাজা দ্বিতীয় জন। তিনি জলপথে অভিযানের আগে স্থলপথে বিভিন্ন অঞ্চল আবিষ্কারের কাজে নিয়োগ করেছিলেন ইহুদিদের।

গুপ্তচরদের নিয়ে রাজা জন দুটি দল তৈরি করেছিলেন। এর প্রথমটির নেতা ছিলেন অ্যান্টোনিও ডিলিসবোয়া। আরবি ভাষা না জানার কারণে সে অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। পরের অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আফনসো ডি পেইভা ও পেরো ডি কোভিলহাম। ১৪৮৭ সালের ৭ মে তাঁদের অভিযান শুরু হয় পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে। তাঁরা দুজনই আরবি ভাষা জানতেন খুব ভালো। তাঁরা আরব বণিকের ছদ্মবেশে সুয়েজ, সুয়াকিন ও এডেন উপসাগরের মুখে টর পর্যন্ত ঘুরে এসেছিলেন। এরপর আফনসো রহস্যময় প্রিস্টার জনের দেশ খুঁজতে চলে যান। আর কোভিলহাম ভারত আবিষ্কারে বেরিয়ে পড়েন।

১৪৮৮ সালের কোনো এক সময় কোভিলহাম ভারতের কালিকট বন্দরে উপস্থিত হন। ছদ্মবেশ থাকা সত্ত্বেও প্রথমে তাঁর চেহারা স্থানীয় মানুষদের সন্দিহান করে তোলে। কিন্তু তাঁর স্পষ্ট আরবি উচ্চারণ মানুষের মন থেকে সে সন্দেহ দূর করে তাড়াতাড়ি। কোভিলহাম বেশ কিছুদিন মালাবার উপকূলের এখানে-সেখানে ঘুরে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেন পর্তুগালের রাজার জন্য।

আফনসো আর কভিলহাম দুদিকে অভিযানে বের হওয়ার সময় ঠিক করেছিলেন, তাঁরা পুনরায় কায়রোতে মিলিত হবেন। ভারতে কাজ শেষ করে কোভিলহাম হরমুজ প্রণালি হয়ে কায়রোয় ফিরে গিয়ে আফনসোর হত্যার খবর পান। এ ছাড়া তাঁর সন্ধানে পাঠানো দুজন পর্তুগিজ ইহুদি রাব্বি আব্রাহাম ও জোসেফেরও দেখা পান সেখানে। কায়রো থেকে আব্রাহামকে সঙ্গে নিয়ে কোভিলহাম হরমুজের উদ্দেশে যাত্রা করেন। কোভিলহামের সফরের অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে জোসেফ ফিরে যান পর্তুগালে। পরবর্তী সময়ে কোভিলহাম তাঁর সফরের সঠিক ও বিস্তারিত বর্ণনা রাজদরবারে পেশ করার জন্য রাব্বি আব্রাহামকে পর্তুগালে পাঠান। হরমুজ থেকে কোভিলহাম একাই আবিসিনিয়া তথা বর্তমানের ইথিওপিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং আমৃত্যু সেখানে একজন সম্মানিত বন্দী হিসেবে বসবাস করেন। ১৫২০ সালে অভিযাত্রী রডরিগো ডি লিমা তাঁকে সেখানে খুঁজে পান।

পেরো দা কোভিলহামের পাঠানো তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে ঠিক ১০ বছরের মাথায়, ১৪৯৭ সালে পর্তুগিজরা ভারতবর্ষে আসে জাহাজে কামান সাজিয়ে, মসলার বাণিজ্য করার জন্য। এ দলের নেতৃত্ব দেওয়া মানুষটির নাম ভাস্কো দা গামা। ইতিহাসে এই ভাস্কো দা গামার নামই লেখা আছে প্রথম ইউরোপীয় নাবিক হিসেবে জলপথে ভারতে আসার কৃতিত্বের জন্য। এ কৃতিত্ব ভাস্কো দা গামার ভাগ্যে জুটলেও কোভিলহামের জোটেনি। কিন্তু গুপ্তচর পেরো দা কোভিলহামের জন্য পর্তুগিজরা প্রায় ১০০ বছর ইউরোপে মসলার বাণিজ্য এবং ভারতসহ এশিয়ার একাধিক দেশে উপনিবেশ তৈরি করতে পেরেছিল।

পর্তুগিজরা যখন মসলার বাণিজ্যে ইউরোপে সবার ওপরে, তখন লাভের অঙ্ক হিসাব করে ডাচরাও এ ব্যবসায় আসতে চাইল। কিন্তু তারা তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। এ জন্য ১৫৯২ সালে ডাচ ব্যবসায়ীরা একটি বৈঠক করে ঠিক করেন, যেভাবেই হোক মসলার ব্যবসায় পর্তুগিজদের একচেটিয়া রাজত্ব বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁরা গুপ্তচর হিসেবে কর্নেলিয়াস দা হাউটম্যানকে পাঠায় পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। এই হাউটম্যানই ১৫৯৫ সালে ডাচদের প্রথম নৌবহরকে নেতৃত্ব দিয়ে মসলার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সফলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যাকে আমরা ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে চিনি। ১৬০২ সালে এই কোম্পানি তৎকালীন নেদারল্যান্ডস সরকারের কাছ থেকে এশিয়ায় একচেটিয়া ব্যবসা করার সনদ পায়। এই ডাচরাই পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজদের হটিয়ে দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার মসলার ব্যবসা দখল করেছিল। পরে মসলার ব্যবসা সংকুচিত হয়ে গেলে বিশ্বব্যাপী কফির ব্যবসাকেও জনপ্রিয় করে তুলেছিল তারা।

শুধু পর্তুগিজ বা ডাচরাই মসলার ব্যবসা করেনি। ইংরেজরা তো বটেই, বাঙালিরাও এককালে মসলার ব্যবসা করে ধনসম্পদের মালিক বনে গিয়েছিল। এর উদাহরণ পাওয়া যায় মনসামঙ্গল কাব্যে।

‘জিরামরিচ মেথি আর ধন্যা শুলফা নিল কালজীরাপঞ্চলবণ সত্বরে লইল।’
(মনসামঙ্গল, ক্ষেমানন্দ দাস)

চাঁদ সওদাগর সিংহল তথা শ্রীলঙ্কায় বাণিজ্য করতে গিয়ে যেসব দ্রব্যের বিকিকিনি করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জিরা, মরিচ, মেথি, ধনে, শুলফা, কালিজিরা, জয়ত্রী, জয়ফল, লবঙ্গ, কর্পূর। বোঝাই যাচ্ছে, বাঙালিও এককালে মসলার ব্যাপারী ছিল!

এই যে মসলা, যার জন্য এত যুদ্ধ, রক্তক্ষয়, এত শ্রম স্বীকার, এটি কিন্তু মূলত কোনো খাবার নয়-খাবারের স্বাদবর্ধক মাত্র। এ ছাড়া কখনো কখনো এটি ভেষজ চিকিৎসার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ দুই কারণে বিভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া যায় প্রাচীনকাল থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই, প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোমের খাবারেও মসলার উপস্থিতি ছিল। এই একুশ শতকে এসে আমরা যদি মসলাগুলোর তালিকা তৈরি করি, সে তালিকা খুব বড় হবে না। আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার করা মসলার মধ্যে রয়েছে রসুন, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, এলাচি, তেজপাতা, গোলমরিচ, জয়ফল, জয়ত্রী, জিরা, কালিজিরা, হলুদ, মেথি, মৌরি, সরিষা, রাঁধুনি, ধনে, জোয়ান, হিং, কাবাবচিনি, চুই। আমাদের একেবারে স্থানীয় কিছু মসলা এককালে ব্যবহৃত হলেও এখন সেগুলোর ব্যবহার সংকুচিত হয়ে গেছে। যেমন পিপুল, বজ ইত্যাদি। আবার মসলা না হলেও মসলার মতো ব্যবহার করা হয় কিছু শস্যদানা ও ফুলের কেশর। যেমন জাফরান, পোস্ত। এগুলো ছাড়া আছে কিছু হার্বস। যেমন ধনেপাতা, কারিপাতা ইত্যাদি। বলে রাখা ভালো, মসলা হলো সেই জিনিস, যেগুলোর নিজস্ব স্বাদ-গন্ধ আছে। প্রথাগতভাবে মসলা উৎপন্ন হয় মসলাজাতীয় উদ্ভিদের ফুল, ফল, কাণ্ড, বাকল ও শিকড় থেকে।

পুরো পৃথিবীতে খাবারের স্বাদ বাড়াতে মসলা ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মসলা ছাড়া আলু-মাংসের ঝোল, কিংবা পাঁচফোড়ন ছাড়া ডাল ও সবজির কথা ভাবা যায় না। ডিমের সোনালি রঙের পোঁচের ওপর ব্ল্যাক পেপার ওরফে গোলমরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে না খেলে নাকি ডিমের স্বাদের আভিজাত্য বাড়ে না। মরিচ আর পেঁয়াজকুচির সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে বাঙালি আয়েশ করে ডিমের মামলেট মতান্তরে অমলেট খাচ্ছে যুগ যুগ ধরে! দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, জায়ফল-জয়ত্রী দিয়ে কষিয়ে মাংস রান্না অথবা ঝোল ঝোল করে আলু দিয়ে মাংস, হালকা জিরা দিয়ে মাছের ঝোল, সরষে দিয়ে ইলিশ, পাঁচফোড়নের সম্বরা দেওয়া ডাল অথবা সবজির ঘন্ট, মরিচ টেলে আলুর ভর্তা-ভাবা যায়, এসব খাবারে কোনো মসলা নেই! অথবা একবার ভাবুন তো মসলার ছাড়া বিরিয়ানির কথা! ‘কালা ভুনা’য় দারুচিনি না থাকলে আপনি কি তাকে মেনে নেবেন?

খেয়াল করলে দেখা যাবে, একেক পদের খাবারে মসলা ব্যবহারের তরিকা একেক রকম। বাঙালি খাবারে গোটা-বাটা-গুঁড়া মসলার মায়াবী ইন্দ্রজাল তো আছেই, কোনটাতে আবার আছে পাঁচফোড়নের অস্থির উপস্থিতি। কোনো খাবারে পেঁয়াজ ভেলকি দেখায় তো কোনো খাবারে শুধুই রসুন। এই গোটা-বাটা-গুঁড়া আর পাঁচফোড়ন ব্যবহারের সূক্ষ্ম কারুকাজ বাঙালি শিখেছে শয়ে শয়ে বছরের অভিজ্ঞতা আর চর্চার কারণে। মসলা চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার শিলপাটা/নোড়া ও হামানদিস্তা। খ্রিষ্টীয় অষ্টম-নবম শতকে ময়নামতিতেও শিলপাটা/নোড়ার ব্যবহার দেখা গেছে। এখনো সীমিতভাবে শিলপাটা/নোড়া আর হামানদিস্তার ব্যবহার হয়ে থাকে মসলা বাটার জন্য। এ কাজে ধীরে ধীরে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গ্রাইন্ডারের ব্যবহার। তবে এখন প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলার ব্যবহার বেশি। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুঁড়া মসলার প্যাকেট পাওয়া যায়। এ ছাড়া চায়নিজ, থাই ও ইউরোপীয় বিভিন্ন খাবার বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বর্তমানকালে। এসব খাবার রান্নার উপযোগী সিচুয়ান পিপারকর্ন, ফার্মেন্টেড সয়াবিন, ফাইভ স্পাইস পাউডার, এনিসসিডস, সিচুয়ান হট চিলি অয়েল, অলিভ অয়েল, বিভিন্ন ধরনের চিজ ও সস ইত্যাদি মসলা এবং অন্য জিনিসপত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন সুপারশপে।

শুধু খাবারকে সুস্বাদু করাই নয়, রূপচর্চা ও ভেষজ চিকিৎসার জন্য প্রাচীন ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে মসলা এবং মসলাজাতীয় উদ্ভিদের ব্যবহার হয়ে আসছে। ‘হোম রেমিডি’ হিসেবে এখনো এর ব্যাপক ব্যবহার চোখে পড়ে। পেটে বায়ু জমলে আদার রস আর গরম পানি খাওয়া, শিশুদের সর্দি-কাশিতে খাঁটি সরিষার তেলে কালিজিরা ফুটিয়ে তা বুকে-পিঠে মালিশ করা থেকে শুরু করে রূপচর্চার জন্য কাঁচা হলুদের ব্যবহারের মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদচর্চার ধ্বংসাবশেষ এখনো বহমান রয়েছে আমাদের জীবনে। রসুনের গুণের কথা যেমন আমরা জানি, তেমনি এর অ্যান্টিবায়োটিক গুণের কথা জানত মিসরের মানুষ-খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৯৫ সালেও। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে গ্রিসে হারবাল চিকিৎসার প্রসার ঘটে। ওই সময়ের সেরা বই কর্পাস হিপোক্রেটিয়াম-এ লেখক হিপোক্রেট (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০) ২৩০টি ভিন্ন ভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদের পরিচয় তুলে ধরেন। এর কয়েক বছর পরে উদ্ভিদবিদ্যার জনক থিওফ্রস্টাস (আনুমানিক ৩৪৭-২৮৭ খ্রিষ্টপূর্ব) উদ্ভিদ নিয়ে লেখা বইয়ে দারুচিনি ও এলাচির মতো এশীয় মসলার কথা তুলে ধরেন। প্রাচীন রোমেও মসলা ও বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদের ভীষণ কদর ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে মধ্য ইউরোপের অধিবাসী হিলডেগার্ডের লেখায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে উদ্ভিদের ব্যবহারের কথা দারুণভাবে উঠে এসেছে।

মসলার ভেষজ গুণের কথা এত ছোট পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তাই বরং আপনাদের ভিন্ন রকম কিছু তথ্য দিয়ে রাখি। মসলা কীভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার অনেক অনুমানভিত্তিক গল্প রয়েছে। যেমন প্রাচীন রোমান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বহু মসলা মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে বহু শতাব্দী ধরে সিল্ক রোড হয়ে চীন থেকে ইউরোপে বাণিজ্য চলার কারণে সে পথে বণিকদের মাধ্যমে এশিয়া থেকে অনেক মসলা ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিল। বহু পথ পাড়ি দিয়ে এভাবে মরিচও আমাদের হাতে আসে। প্রাচীন মসলাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই মরিচের অস্তিত্ব ছিল আমাজন এবং ইকুয়েডর উপকূলে-আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পর এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতের মালাবার উপকূল হয়ে বাংলায় আসে। এ অঞ্চলে সে সময় খাবারে ঝাল স্বাদ আনতে ব্যবহার করা হতো মূলত গোলমরিচ। স্থানীয়ভাবে চুইও ঝাল স্বাদের জন্য ব্যবহার করা হতো, এখনো যেমন হয়ে থাকে। গোলমরিচ, এলাচি, দারুচিনি ও জায়ফলের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ মসলাগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলেই জন্মাত। এখান থেকেই এই মসলাগুলো খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে মিসরে রপ্তানি হতো।

মসলা শুধু স্বাদবর্ধক কিংবা ভেষজ উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হতো না। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবেও মসলার গুরুত্ব ছিল। সিল্করুট ধরে যখন ব্যবসা প্রচলিত ছিল, তখন সিল্ক, রুপা, ফারের মতো মূল্যবান পণ্যের সঙ্গে মসলার বিনিময় করা হতো। তেরো-চৌদ্দ শতকে উত্তর মিসরের কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, ভেনিস, জেনোয়া, পিসা ইত্যাদি বড় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে এক পাউন্ড জাফরানের মূল্য একটি ঘোড়া এবং এক পাউন্ড আদার মূল্য একটি ভেড়ার সমান ছিল বলে কথিত আছে। এ ছাড়া গোলমরিচের বিনিময় হতো সোনার সঙ্গে।

‘আমার গল্প ফুরাল, নটে গাছটি মুড়লো’-মসলার গল্প শোনাতে বসে এ রকম বলা সম্ভব নয়। মূলত পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বাণিজ্যের গতিপথে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলা এই মসলার গল্পটা বেশ জটিল। তার চেয়েও জটিল এর স্বাদের ইন্দ্রজাল। এত রক্তপাত, এত যুদ্ধ, জলপথ আবিষ্কারের এত কষ্ট স্বীকার-সবকিছুই মসলার স্বাদের জন্য।

তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা:
১. মসলার যুদ্ধ, সত্যেন সেন, মুক্তধারা, দ্বিতীয় প্রকাশ, ১৯৮০।
২. দ্য রেইজ অব পর্তুগিজ পাওয়ার ইন ইন্ডিয়া (১৪৯৭-১৫৫০), আর. এ. হোয়াইটওয়ে, এশিয়ান এডুকেশনাল সার্ভিস, নিউ দিল্লি, ১৯৮৯।
৩. স্পাইস, সাবিন কর্জ, ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন, জার্মানি।
৪. দ্যেবদ্যুতি রায়।

সৌজন্যে: প্রথম আলো বর্ণিল খাবারদাবার