‘সোনালি ব্যাগের’ প্রতিপক্ষ পলিথিন

image_titleসোনালি আঁশের দেশ বাংলাদেশ। সোনালি আঁশ তথা পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যময় আঁশ উৎপাদনকারী ফসল। প্রাচীনকাল থেকে এ দেশের কৃষকদের পাটের...সোনালি আঁশের দেশ বাংলাদেশ। সোনালি আঁশ তথা পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যময় আঁশ উৎপাদনকারী ফসল।

প্রাচীনকাল থেকে এ দেশের কৃষকদের পাটের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা লক্ষ করা যায়।পাটের সঙ্গে এক গভীর আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ এ দেশের কৃষক, যে বন্ধনের ভিত্তিতে আমাদের কৃষক যুগের পর যুগ ধরে পাটের সঙ্গে রয়ে গেছেন।এক বছর হয়তো পাটের দাম কম পেয়েছেন, কিন্তু পরের বছর ঠিকই নানা সংশয় ও দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে পাট চাষ করেছেন। পাটের প্রতি কৃষকের এই দরদ ও ভালোবাসা পাটশিল্পের সম্ভাবনাকে প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখছে, এগিয়ে নিচ্ছে।পাট খাতে বাংলাদেশকে নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এ খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে।পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার পাট দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০১৭ সালের ৬ মার্চ প্রথমবারের মতো জাতীয় পাট দিবস পালন করা হয়, যেটা বাংলাদেশের পাটশিল্পের জন্য নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে পাট নিয়ে আমাদের উৎসাহ ও জনসচেতনতা যেমন বাড়ছে, তেমনই স্বপ্ন দেখার পরিসরটাও বড় হচ্ছে। এ স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোবারক আহমদ খান রেখেছেন সব থেকে বড় অবদান।তিনি পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ উদ্ভাবন করেন, যা ২০১৭ সালের ১২ মে লতিফ বাওয়ানি জুট মিলে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করা হয়েছে। পাট থেকে উৎপাদিত এ পলিব্যাগের উপকারিতার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর নাম দিয়েছেন ‘সোনালি ব্যাগ’।এমন গৌরবময় উদ্ভাবনের ফলে পাটশিল্পের বিকাশ দ্রুত সম্ভব হবে বলে মনে হয়। তবে সোনালি ব্যাগের সম্ভাবনা বিনষ্ট হতে চলেছে মানুষের পলিথিনপ্রীতি, যা একশ’ বছরেও পচবে না বা মাটির সঙ্গে মিশবে না। পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব মানুষ ছাড়াও পড়ছে নানা পশু-পাখি, জলজ প্রাণী; এমনকি পরিবেশের ওপর।এমন ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে ২০০২ সালে প্রথম পলিথিন ব্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়।কিন্তু দামে সস্তা ও পলিথিন-পলিব্যাগের বিকল্প না থাকায় সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

সোনালি ব্যাগ পরিবেশের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালেই দেখতে পাব। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭২টি দেশ পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। পলিথিনের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই এখনই সময় সোনালি ব্যাগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন ধারা সূচনার।পলিথিনের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা অবলম্বন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পচনশীল ‘সোনালি ব্যাগ’ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। যেহেতু পাট উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে আমরা, তাই এ উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বেকার সমস্যার সমাধানসহ দেশের অর্থনীতিকে মুক্তি দেয়া সম্ভব। এ সোনালি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।আমাদের দেশে পাট চাষের মূল সমস্যা চাষীরা সঠিক সময়ে মানসম্মত বীজ পায় না। ফলে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বীজের ওপরই ভরসা করতে হয় তাদের। বিদেশ থেকে নিয়ে আসা বীজের মান নিয়ে থেকে যায় প্রশ্ন। অধিক দাম ও অপরিপক্ব বীজের ওপর ভরসার ফলে অনেক কৃষক ক্ষতিরও সম্মুখীন হয়।তাই দেশে মানসম্মত বীজ উৎপাদন করে বীজের চাহিদা পূরণ করতে হবে। এতে করে দেশের প্রতি কৃষকের আস্থা বাড়বে আর সাশ্রয় হবে দেশের অর্থ। পাটে পোকামাকড়ের আক্রমণ, মানসম্মত কীটনাশক না পাওয়াও কৃষকদের জন্য বড়ই চিন্তার বিষয়।এজন্য উন্নত কীটনাশক সরবরাহ করা অতীব জরুরি। মানসম্মত পাট উৎপাদন ও পাটের বহুমুখী ব্যবহারকরণের পাশাপাশি যথাসময়ে ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছ থেকে পাট ক্রয়েও নিতে হবে সুষ্ঠু পরিকল্পনা।সরকারের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ও পাটপণ্যের সুষ্ঠু ব্যবহারও প্রয়োজন। পলিথিন ব্যবহারের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।সামাজিকভাবে পরিবেশ রক্ষার নিমিত্তে নানা সভা-সেমিনারের আয়োজন করে পলিথিন সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষদের এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। পাট থেকে উৎপাদিত সোনালি পলিব্যাগের ব্যবহারের সুফল ও ব্যবহারে জনমানুষকে উৎসাহিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।এর পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে ঘরের দরকারি সব পণ্যের মধ্যে অন্তত একটি করে পণ্যও যদি আমরা পাটের ব্যবহারে করতে পারি, দেশে পাটের একটা বড় বাজার তৈরি হবে। পাটপণ্য উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি বাজারের পাশাপাশি দেশি বাজারের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।দেশে কীভাবে পাটপণ্যকে জনপ্রিয় করা যায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে পাটপণ্যের প্রতি ভালোবাসা ও ক্রয় চাহিদা বাড়ানো যায়, সে কাজটাও এগিয়ে নিতে হবে। পরিবেশবান্ধব শৈশব তৈরির জন্য আমরা শিশুদের হাতে পাটের স্কুলব্যাগ, পেনসিল বক্স তুলে দিতে পারি।এতে করে শৈশবে আমাদের শিশুরা যেমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাটকে চিনবে, তেমনি ওদের মধ্যে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় ইতিবাচক মানসিকতাও তৈরি হবে।মানসম্মত পাট উৎপাদন, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, পাটপণ্যের ব্যবহার বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন, পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ- এ পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’ খসড়ার অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা, যেখানে পাট খাতে অগ্রগতির জন্য গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধিসহ নানা পরিকল্পনা লক্ষ করা যায়। জাতীয় পাটনীতি-২০১৮ বাস্তবায়ন হলে পাট খাতে নতুন সূর্য উদিত হবে।সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা।