চট্টগ্রামে ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকট বাড়ছে

image_titleচট্টগ্রামে ব্যাংকার ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট দিন দিন বাড়ছে। শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে অনেক রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী...চট্টগ্রামে ব্যাংকার ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট দিন দিন বাড়ছে। শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে অনেক রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী তা ফেরত না দিয়ে বহাল তবিয়তে থাকলেও ছোট অঙ্কের ঋণগ্রহীতারা ব্যাংকের রোষানলে পড়ছেন।অনেক ক্ষেত্রে রি-সিডিউল বা নবায়ন করার কথা বলে ঋণের মূল টাকা সমন্বয় করা হলেও প্রদত্ত সিকিউরিটি চেকের বিপরীতে এ ধরনের গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিচ্ছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

কখনও অর্থঋণ আদালতে, কখনও আবার এনআই অ্যাক্টের মামলা দেয়া হচ্ছে।এ অবস্থায় ঋণগ্রহীতারা না পারছেন ব্যাংকের ঋণ বা সুদের টাকা পরিশোধ করতে; না পারছেন নতুন করে ব্যবসা করে ঘুরে দাঁড়াতে। গত বছর চট্টগ্রামে ঋণখেলাপি ৬৬৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণগ্রহীতা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।এদিকে ভুক্তভোগীরা বলছেন, ব্যাংকগুলো ‘সুসময়ের বন্ধু’ হলেও দুঃসময়ে বিপদের মুখেই ঠেলে দিচ্ছে ছোট ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের। সাত-পাঁচ লাভ দেখিয়ে ব্যবসা করার জন্য, এলসি লিমিট বাড়ানো বা নবায়নের জন্য উৎসাহিত করে ব্যাংকাররা সুদ হিসেবে ব্যবসার নির্যাসটুকু নিয়ে নিচ্ছেন।অথচ ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা লোকসানের মুখোমুখি হলে সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে না।চট্টগ্রামের টেরিবাজারের ব্যবসায়ী ছিদ্দিক ছাতার মালিক আবু সায়িদ সম্রাট যুগান্তরকে জানান, তিনি ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেন ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, আগ্রাবাদ শাখা থেকে। ২০০৭ সালে নেয়া এই ঋণের বিপরীতে ৬ বছরে সুদ দিয়েছেন ৪২ কোটি টাকা।আসল টাকারও সিংহভাগ পরিশোধ করেছেন। এরপরও ৫৬ কোটি টাকা পাওনা দাবিতে প্রদত্ত সিকিউরিটি চেকের বিপরীতে তার বিরুদ্ধে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মামলা ঠুকে দিয়েছে। অথচ এই ঋণের বিপরীতেই ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ দেয়া আছে তার ৫৫৬ শতক মূল্যবান জমি। যার মূল্য ঋণের টাকার প্রায় দ্বিগুণ হবে। কিন্তু জমিটিও ব্যাংক ছাড় করছে না।এ অবস্থায় তিনি না পারছেন মর্টগেজ দেয়া সম্পদ বিক্রি করতে, না পারছেন ব্যাংকের সুদের টাকা পরিশোধ করতে। উল্টো তাকে হতে হয়েছে মামলার আসামি।

কেবল এই একজন ব্যবসায়ী নন; এভাবে চট্টগ্রামে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং শিল্পোদ্যোক্তারা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করলেও সুদের ওপর চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ কষা হচ্ছে।দেয়া হচ্ছে মামলা। ফলে ভুক্তভোগীরা নতুন খাতে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এ অবস্থায় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকট। পক্ষান্তরে রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী তথা ব্যাংক মালিক ও পরিচালকরা হাজার হাজার কোটি টাকা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও পাচার করলেও তাদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী সাধারণ ব্যবসায়ীদের।এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন উপপরিচালকের সঙ্গে কথা হয় যুগান্তরের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই উপপরিচালক যুগান্তরকে বলেন, ‘কেবল যে ব্যবসায়ীদের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে তা নয়; অনেক সময় ব্যাংকাররাও তাদের দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করেন না। সুসময়ে ব্যবসা করার জন্য উৎসাহিত করে লাভের অঙ্ক লুফে নিলেও দুঃসময়ে সহযোগিতার হাত বাড়ান না।এটাও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া ঋণ দেয়ার সময় জায়গা বা সম্পদের ওভার ভেল্যুয়েশন করে এর বিপরীতে ঋণ প্রদান করা হয়। পরে খেলাপি হলেও বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তুলে ঋণ সমন্বয় করার সুযোগ থাকে না। তাই ঋণখেলাপির তালিকা বড় হওয়ার পেছনে এটাও একটি কারণ।’চট্টগ্রামে গত বছর ৬৬৮ খেলাপি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক ও অর্থঋণ আদালত সূত্রে জানা যায়, ভোজ্যতেল আমদানিকারক, আবাসন খাতের উদ্যোক্তা, পোশাক উৎপাদন ও জাহাজ ভাঙা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের পাইকারি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় আর্থিক প্রতষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নেয়।কিন্তু চড়া সুদের মাশুল গুনতে গিয়ে তাদের অনেকে খেলাপি হয়ে পড়েছেন। আবার ব্যবসায়িক লোকসানসহ নানা কারণে সময়মতো অনেকে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। কিন্তু এ নিয়ে ব্যাংকগুলোর কোনো মাথাব্যথা নেই।।