বৃষ্টিবিলাসের খানাখাদ্য

image_title

ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি পড়ছে দিনভর। আকাশে কালো মেঘের মেলা। বাইরে যাওয়ার উপায় নেই হাঁটুপানির জন্য। কতক্ষণ আর বসে বসে টিভি দেখা যায়।

এমন সময় কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না? এই ‘ভেবে না পাওয়ার’ ব্যাপারটা একটু হলেও কেটে যাবে যদি আপনি খাবারের দিকে মুখ ঘোরান। কি, খাবারের কথা শুনেই লাফিয়ে উঠলেন? লাফিয়ে ওঠারই কথা। তবে একা একা খাবার বানিয়ে খেতে অনেকেরই বেশ আলস্য হয়। আলস্য ছাড়ুন। উঠে দাঁড়ান এবং খাবার তৈরি করে খেয়ে নিন।

বৃষ্টির দিনের দুর্দান্ত খাবার হিসেবে জনপ্রিয় হলো মুচমুচে ভাজাপোড়া। কুড়মুড় করে চিবিয়ে খেতে খেতে জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখা কিংবা পছন্দের গান শোনা অথবা পছন্দের বই পড়া সবকিছুই করা যায় যদি আপনি চান। তবে সব সময় সবকিছু খেলে হবে না। খাবারও সময় আছে, দিন বা রাতের একেক সময় একেক ধরনের খাবার খাওয়ার মজাও আছে। যেমন সকালের দিকে সাধারণ নাশতা যা খান সেটা খেতে পারেন। বৃষ্টি মানেই বাঙালির খিচুড়ি খাওয়া। দুপুরে ভাতের বদলে খিচুড়ি খেতে পারেন ভুনা, ল্যাটকা যেকোনো একটি। দুপুর এবং সন্ধ্যার মাঝামাঝি সময়টাই আসল। এই সময়েই আমাদের ‘অন্য রকম কিছু একটা’ খেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের এই ‘অন্য রকম কিছু একটা’ আসলে এখনো ‘মুরগি-রুটি’র বাইরে যেতে পারেনি। বিকেল বেলা যদি আপনি রাস্তায় হাঁটেন, নিজেই তার প্রমাণ পাবেন।


‘অন্য রকম কিছু একটা’ খেতে আপনি যেখানেই যান না কেন, আপনাকে খেতে হবে চিকেন প্রিপারেশনের খাবার, তা সে আপনি গলির মোড়ের ‘হোটেলে’ই যান আর ‘এফসি’ যুক্ত রেস্টুরেন্টেই যান। এ অবস্থা থেকে আপনাকেই বেড়িয়ে আসতে হবে। তৈরি করে নিতে হবে নিজের পছন্দের খাবার।
আমাদের পরামর্শ হলো, বৃষ্টির দিনে শুকনো মুচমুচে খাবার খান। তবে খুব বেশি তেলে ভাজা খাবার খাবেন না। এতে ক্ষতিই হবে বেশি। চিড়ার ভাজা খেতে পারেন, যাকে ‘দোভাজা’ও বলা হয়। আপনার পাশের মুদি বা গ্রোসারির দোকান থেকে চিড়া কিনে রাখুন। পরিষ্কার করে পরিমাণমতো নিয়ে ভেজে ফেলুন। ভাজার আগে আপনার কড়াই বা ফ্রাই প্যান ভালো করে গরম করে নিন। তারপর তাতে চিড়া দিন। নাড়তে থাকুন। মচমচে হয়ে গেলে তুলে ফেলুন। বেশি ভাজলে তিতা হয়ে যাবে। এবার এই ভাজা চিড়ার সঙ্গে অল্প পরিমাণ লবণ, পেঁয়াজ-মরিচকুচি, চানাচুর মিশিয়ে নিন। মেশানোর আগে পরিমাণমতো সরিষার তেল দিন ভাজা চিড়ায়। তারপর মাখতে থাকুন। ভালোমতো মাখা বা মেশানো হয়ে গেলে খেয়ে দেখুন। বর্ষার বিকেল আপনার ফুরফুরে হয়ে যাবে। চিড়াভাজার মতোই আর একটা খাবার হলো চালভাজা।
একটু কেমন লাগবে বটে। কিন্তু চালভাজাও একটি দুর্দান্ত খাবার। বাসায় যে চাল আছে পরিমাণমতো সেই চাল নিন। চাল ভেজাবেন না। পরিষ্কার করে চিড়ার মতোই ভেজে নিন। এর সঙ্গে অল্প লবণ, পেঁয়াজ-মরিচকুচি, চানাচুর মিশিয়ে নিন। তারপর সরিষার তেল দিয়ে মাখতে থাকুন। বড় দানার চানাচুর ব্যবহার করুন। মাখা বা মেশানো শেষ হলে আয়েশ করে বসুন জানালার ধারে অথবা টিভির সামনে। খেয়ে দেখুন, বিকেলটা আপনার অন্য রকম হলেও হতে পারে। তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন, চালভাজা বেশ ভারী খাবার। বেশি খাবেন না।
এবার বলা যাক বিখ্যাত মুড়িমাখার কথা। এটি এতই জনপ্রিয় যে নতুন করে আর কিছু বলার নেই। তবে নতুন করে আপনি মুড়িমাখাও তৈরি করতে পারেন। মুচমুচে মুড়ি নিন পরিমাণমতো। সরিষার তেল অবশ্যই। সঙ্গে পেঁয়াজ-মরিচকুচি, চানাচুর মিশিয়ে নিন। এবার মাখাতে শুরু করুন। অবশ্যই বড় দানার চানাচুর ব্যবহার করুন দুর্দান্ত স্বাদের জন্য। এর সঙ্গে যদি এক কাপ গরম চা হয়, তো মন্দ কাটবে না আপনার সময়। মুচমুচে মুড়ি নেতিয়ে গেলে মাখানোর আগে হালকা করে ভেজে নিন। ভেজে নিলেই মুড়ি আবার মুচমুচে হয়ে উঠবে। তবে বেশি দিন যদি নেতানো অবস্থায় থাকে তাহলে সে মুড়ি না খাওয়াই ভালো। তাতে ফাঙ্গাস পড়ে যেতে পারে।
মুড়ি মাখায় আপনি চাইলে টমেটো, ধনেপাতা, কালোজিরা, শসা ইত্যাদিও ব্যবহার করতে পারেন। আসলে চিড়াভাজা বা চালভাজাতেও আপনি এসব যুক্ত করতে পারেন স্বাদ বাড়ানোর জন্য। তবে এটা করলে মুড়িমাখার যে মজা সেটা থেকে আপনি বঞ্চিত হবেন।
এ ছাড়া আপনি বিভিন্ন ধরনের বীজও ভেজে খেতে পারেন বৃষ্টির দিনে আয়েশ করে। বীজের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো বাদাম, বুট, কাঁঠালবিচি, সরষেদানা। বাদামভাজার প্রক্রিয়া আপনাকে নিশ্চয়ই শিখিয়ে দিতে হবে না। গ্রোসারিতে ভাজা বাদামও পাওয়া যায় আজকাল। তেল-লবণ-পেঁয়াজ-মরিচ মেখে খেতে পারেন আবার এমনিতেও ভাজা বাদাম খেতে পারেন। এ ছাড়া ওপরে বলা মুড়ি, চিড়া বা চালভাজার সঙ্গেও এটি মিশিয়ে খেতে পারেন। বুট বা ছোলা পরিষ্কার করে নিয়ে ফ্রাই প্যানে ভেজে নিন। তারপর তেল-লবণ-পেঁয়াজ-মরিচ মাখিয়ে খেয়ে নিতে পারেন অথবা মুড়ি, চিড়া, চালভাজার সঙ্গেও মিশিয়ে খেতে পারেন। কাঁঠাল বিচিতে আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে। শুকনো বিচির ওপরের আবরণ তুলে ফেলুন। তারপর সেদ্ধ করুন। সেদ্ধ হলে অন্যান্য সবজি, বিশেষ করে আলু যেভাবে ভাজেন সেভাবে ভাজুন। অথবা শুকনো বিচি ফ্রাই প্যানে চেলে নিন। শক্ত হয়ে গেলে আবরণ তুলে ফেলে তেল-লবণ-পেঁয়াজ-মরিচ মাখিয়ে খেয়ে নিন।
আর একটি খাবার আছে, যার কথা আমরা তেমন একটা বলি না। সেটা পাঁপড়। মুদি দোকান বা গ্রোসারিতে পাঁপড় কিনতে পাবেন। এক প্যাকেট কিনে নিন। প্যাকেট খুলে পাঁপড় মাঝামাঝি ভাঁজ করে ছিঁড়ে ফেলুন অর্ধেক করে। তারপর সমতল ফ্রাই প্যানে ডুবো তেলে ভেজে নিন। বিকেলের জন্য এটি চমৎকার একটি খাবার।



এবার আপনাদের জন্য দুটি টিপস একেবারে বিনা মূল্যে।
১. মুড়ি মুখবন্ধ প্লাস্টিকের জারে রাখুন। অপ্রয়োজনে জারের মুখ খুলবেন না। মুড়ির ভেতর ডুবিয়ে রাখতে পারেন দানা গুড়। তাহলে সে গুড় দীর্ঘদিন ভালো থাকবে। বিস্কুট বা কুকিজের প্যাকেটও রাখতে পারেন মুড়ির জারে। তাতে এগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকবে। মুড়ি খাওয়ার পর অনেকের গ্যাসের সমস্যা হতে পারে। মুড়ির সঙ্গে চা না খেলে খাওয়া শেষ করার অন্তত আধঘণ্টা পর পানি পান করুন। তাতে সমস্যা হবে না। মুড়ির সঙ্গে অনেকেই হালকা লবণ যোগ করে থাকেন। মুড়ির সঙ্গে লবণ মেশাবেন না। মনে রাখবেন, মুড়ি ভাজার সময় লবণ ব্যবহার করা হয়। রাস্তার ধার থেকে বা টং দোকানে রাখা প্যাকেটের মুড়িভাজা খাবেন না। এগুলো খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। মুড়ির সঙ্গে পেঁয়াজি কিংবা কোনো ধরনের চপ মেশাবেন না। তাতে মচমচে মুড়ি মাখার স্বাদ পাবেন না।
২. দীর্ঘদিন ভালো রাখার জন্য চিড়া কাচের বয়ামে সংরক্ষণ করুন। বেশি দিন রাখলে চিড়ায় ফাঙ্গাস পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই চিড়া না খাওই ভালো। সকালবেলা দই, চিড়া এবং আখের গুড় ভালো নাশতা হিসেবে পরিচিত।
৩. পাঁপড়ও কাচের বয়ামে সংরক্ষণ করুন। তাতে দীর্ঘদিন এটি ভালো থাকবে।

মুড়ি, চিড়াভাজা, চালভাজা বা বাদাম-ছোলা-কাঁঠালের বিচি-পাঁপড়, এই খাবারগুলো আহামরি কোনো খাবার নয়। তবে এই বৃষ্টির দিনে এগুলো খেলে মজা পাবেন। নিজে নিজেই এই খাবারগুলো তৈরি করুন। দেখবেন খাওয়াও হচ্ছে আবার মানসিকভাবে কিছুটা আনন্দও পাচ্ছেন।