লর্ডসে জিতবে ক্রিকেট: ২৩ বছর পর নতুন চ্যাম্পিয়ন পাবে বিশ্বকাপ

দীর্ঘ যাত্রার সব বাঁক পেরিয়ে একদম শেষ ধাপে চলে এসেছে বিশ্বকাপ। আগামীকাল লর্ডসের ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। দু’দলের কেউই...দীর্ঘ যাত্রার সব বাঁক পেরিয়ে একদম শেষ ধাপে চলে এসেছে বিশ্বকাপ। আগামীকাল লর্ডসের ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।

দু’দলের কেউই আগে পায়নি শিরোপার স্বাদ। বিশ্বকাপ তাই এবার পাচ্ছে নতুন চ্যাম্পিয়ন।রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় লর্ডসের ব্যালকনিতে যে দলই শিরোপা উৎসব করুক, দিনশেষে জিতবে ক্রিকেট। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের ফাইনালে উঠে আসা ক্রিকেটের জন্য দারুণ এক স্বস্তির উপলক্ষ।৪৪ বছরের পথচলায় ঘুরেফিরে ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা উঠেছে মাত্র পাঁচটি দলের হাতে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলংকার সৌজন্যে সর্বশেষ নতুন কোনো চ্যাম্পিয়ন পেয়েছিল ক্রিকেট।২৩ বছর পর অবশেষে ষষ্ঠ রাজার গলায় বরমাল্য তুলে দেয়ার সৌভাগ্য হচ্ছে ক্রিকেটের। খেলাটির অস্তিত্ব ও বিশ্বায়নের স্বার্থে এমন কিছুই ছিল সময়ের দাবি।মাঠে ও মাঠের বাইরে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের প্রবল দাপটে বিশ্বকাপ মঞ্চে ক্রিকেটের গৌরবময় অনিশ্চয়তার ব্যাপারটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। এবারও যেমন লিগপর্বে অনেক নাটকীয়তার পরও শেষ পর্যন্ত চার ফেভারিট দলই পা রেখেছিল সেমিফাইনালে।এর মধ্যে ফাইনালের দৌড়ে ফেভারিট ধরা হয়েছিল গত দু’আসরের দুই চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে। অনুমিত ফলটা মিলে গেলে সেটা হতো ক্রিকেটের জন্য দুঃসংবাদ।সেমিফাইনালের লাইনআপ চূড়ান্ত হওয়ার পর এমনটাই বলেছিলেন নিরপেক্ষ মতামতের জন্য বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল, ‘এখন পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে, ফাইনাল হবে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে, যা বেশ আগে থেকেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ক্রিকেটের জন্য, বিশ্বকাপের জন্য একটা ধাক্কা দরকার। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে ভারত, ১৯৯২ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ও ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলংকা যা করেছিল, তেমন আরেকটি ধাক্কা খুব দ্রুত দরকার।’চ্যাপেলের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হলেও তার প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।

প্রথম সেমিফাইনালে ভারতকে ১৮ রানে হারিয়ে প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। এরপর অস্ট্রেলিয়াকে আট উইকেটে হারিয়ে ইংল্যান্ড নিশ্চিত করেছে, ২৩ বছর পর নতুন চ্যাম্পিয়ন পাচ্ছে বিশ্বকাপ।শিরোপার স্বাদ না পেলেও ফাইনালের মঞ্চটা অচেনা নয় দু’দলের জন্য। সেমির গেরো খুলে গত আসরেই প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলেছে নিউজিল্যান্ড। অন্যদিকে ২৭ বছর পর ফাইনালে পা রাখা ইংল্যান্ড তিনবার পেয়েছে রানার্সআপ হওয়ার তেতো স্বাদ।দু’দলের যে কোনো একটির প্রথম শিরোপার দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচবে এবার। তাতে ক্রিকেট পাবে ‘অক্সিজেন’। ফুটবল ও টেনিস নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা, ক্রিকেটের বাড়বাড়ন্ত তখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এশিয়ায়।আরও নির্দিষ্ট করে বললে উপমহাদেশে। এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বকাপের একসময় এশিয়া কাপে রূপ নেয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। খেলাটির জন্ম যে দেশে, সেই ইংল্যান্ডেই জনপ্রিয়তায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে ক্রিকেট। তবে ২৭ বছর পর স্বাগতিকরা ফাইনালে ওঠায় আবারও ক্রিকেটে আকৃষ্ট হতে পারে ইংল্যান্ডের নতুন প্রজন্ম।রোববারের ফাইনাল ইংল্যান্ডের টিভি দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে সম্প্রচারের ঘোষণা দিয়েছে চ্যানেল-৪। ২০০৫ সালের অ্যাশেজ সিরিজের পর এই প্রথম কোনো ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে না ইংলিশদের। ক্রিকেট ম্যাচ শুধু পে চ্যানেলে সম্প্রচারিত হওয়ার ব্যাপারটি ইংলিশদের ক্রিকেটবিমুখ হওয়ার অন্যতম কারণ।ইয়ন মরগ্যানদের সাহসী ক্রিকেট ছবিটা ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। গত বছর রাশিয়ায় ফুটবল বিশ্বকাপের সময় ইংলিশদের স্লোগান হয়ে উঠেছিল, ‘ইটস কামিং হোম’। এবার ক্রিকেট বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়েও ‘ইটস কামিং হোম’ উন্মাদনা শুরু হয়েছে ইংল্যান্ডে।শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকরা বিশ্বকাপ জিতলে আগামীতে ওয়েম্বলি বা অল ইংল্যান্ড ক্লাবের মতো লর্ডসও টানবে ইংলিশদের। নিউজিল্যান্ড জিতলেও ক্রিকেটের বিশ্বায়নের পথ সুগম হবে। এখন পর্যন্ত মাত্র ২০টি দল ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলেছে। ছোট দলগুলোকে ভালো করার জন্য অনুপ্রেরণা দিতে পারছে না আইসিসি।আর্থিক শক্তি ও ভালো অবকাঠামো সম্পন্ন দলগুলো আরও জাঁকিয়ে বসছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯৩টি সহযোগী দেশ আইসিসির কাছ থেকে পাবে ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। যেখানে ভারত একাই পাবে ৩২০ মিলিয়ন পাউন্ড। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের কোষাগারেও যায় মোটা অঙ্কের অর্থ। ক্রিকেটের তথাকথিত তিন মোড়লের প্রতিপত্তি খেলাটির জন্য অশনি সংকেত।নিউজিল্যান্ডের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি দল বিশ্বকাপ জিতলে চিরবঞ্চিত ছোটো দলগুলো পাবে স্বপ্ন দেখার জ্বালানি। বিশ্বকাপ ফাইনালে এশিয়ার দর্শক হয়ে যাওয়াটা তাই ক্রিকেটের জন্য কোনো অমঙ্গলের বারতা নয়।ভারতের ফুটবল কিংবদন্তি বাইচুং ভুটিয়ার উপলব্ধি, ‘এই বিশ্বকাপে শুধু ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সমর্থকদের দেখেছি স্টেডিয়ামে। ক্রিকেটকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে অন্য সব দেশের মানুষকেও মাঠে আনতে হবে। এ জন্য একটি পরিবর্তন দরকার।’।