বর্ষাবিলাসের ব্যাচেলর কিচেন

image_title

চলছে বর্ষাকাল। বিলাসী বাঙালির বিবিধ বিলাসের এক অসামান্য সময় এটি। চলাফেরা থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া সবখানেই এই সময় বাঙালি বিলাসের ছাপ পাওয়া যায়। সারা দিন ঝরঝর অঝোর ধারায় বৃষ্টির ধারাপাতে যে ঐকতান সৃষ্টি হয়, গ্রাম-নগর ছাপিয়ে সব বাঙালি তার জন্য অপেক্ষা করে বছরভর।

যাঁরা গ্রামে থাকেন তাঁদের পোয়াবারো। বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে মুষলধারার বর্ষণ চোখের সামনে সৃষ্টি করে ঐশ্বরিক ইন্দ্রজাল। রুক্ষ মাটি হয়ে ওঠে কোমল। প্রকৃতি হয়ে ওঠে শ্যামল। নতুন জলে ভেসে ওঠে সিঁদুরে পুঁটির ঝাঁক। অনবদ্য কদমের ঘ্রাণ নিতে নিতে উদাস হয়ে যাওয়াই সেখানে দস্তুর। আর নগর? এখানে বন্দী যক্ষ। জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে সে এক চিলতে মেঘ দেখে। দেখে কার্নিশে ভিজতে থাকা কাক। তিরতির করে কাঁপতে থাকা বনসাই বট দেখে ভাবে— সে অনেক অনেক দিন আগের একদিন বুড়ো বটের তলে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ঠেকিয়েছিলাম। নগর বড় রুক্ষ। বৃষ্টির কোমল পরশ তাকে শ্যামল করতে পারে না। এখানে মাটি নেই। রুক্ষ পাথর আর কালো পিচের ওপর পড়া বৃষ্টির ফোঁটায় এখানে সাতরঙা বিচ্চুরণ হয় না। এত বৈশাদৃশ্যের পরও নগর আর গ্রামের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেয় সরসের তেলামাখা মুড়ি।

হ্যাঁ, অঝোর ধারাপাতের দিনে চোর–পুলিশ খেলার বয়স, সাথি এবং কালচার সবই চলে গেছে কালের পেটে।

এখন সরসের তেল, পেঁয়াজ আর মুচমুচে চানাচুর মেখে মুড়ি খাওয়াই আপনার কাজ। একটু খুঁজে দেখুন আপনার ফ্রিজে টমেটো আর ধনেপাতা আছে কি না। থাকলে টমেটো কুচি আর ধনেপাতার পরশ থাকতেই পারে মুড়িতে। না থাকলেও ক্ষতি নেই। একে তো নাচনি বুড়ি তার ওপর ঢাকের বাড়ির মতো এবার এই বর্ষাকালেই চলছে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। দুপুরের পর যদি বাসায় থাকেন তো বসে যান টিভির সামনে। আর যদি অফিসে থাকেন তো মুড়ির বাটিটা নিয়ে মোবাইলে বা অফিসের টিভিতে দেখতে থাকুন প্রিয় দলের বোলিং-ব্যাটিং। সঙ্গে হালকা চিনি আর আদা দেওয়া এক কাপ গরম র চা টেস্ট করেই দেখুন। তবে আপনি যদি ভীষণ করপোরেট সংস্কৃতির মধ্যে থাকেন তাহলে আপনার সঙ্গে এই মুড়ি মাখা আর র চায়ের কম্বিনেশনটা নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আপনি ডিম দিয়ে ভাজা নুডলস বা চিকেন নাগেট ভাজা খেতে পারেন ভদ্রতা করে। অথবা খেতে পারেন হালকা তেলে ভাজা যেকোনো রোল। এসব খেলে আপনার জন্য আমার করুণাই হবে। বর্ষার বৃষ্টি আর চিকেন নাগেটই! নাহ। ঠিক মেলে না। কোথায় যেন একটু ফাঁক থেকে যাচ্ছে।

বাসাতেই আছেন তো এই বৃষ্টির দিনে? তাহলে খিচুড়ি বন্দোবস্ত করে ফেলুন। ল্যাটকা, ভুনা যেকোনো রকমের খিচুড়ি আপনি খেতে পারেন আজ। তেমন কোনো কষ্টই হবে না খিচুড়ি রাঁধতে। শিখিয়ে দিই—পরিমাণ মতো চাল ধুয়ে নিন। যে ডাল আছে বাসায় তার খানিকটা ধুয়ে নিন। এবার মরিচ, পেঁয়াজ (কষ্ট করে কেটে ফেলুন), ডাল আর চাল একসঙ্গে দিয়ে হালকা করে ভেজে নিন। এবার ওই পাতিলে পানি দিয়ে দিন। পরিমাণমতো লবণ দিন। যান, এবার ফেসবুক করতে শুরু করুন। মিনিট পনেরো পর একটু দেখুন। বলক উঠলে অল্প পরিমাণ হলুদ দিয়ে দিন। আবার পাঁচ মিনিটের মতো ছুটি। ভুনা খেতে চাইলে চালটা একটু বেশি ভাজুন আর গ্যাসের আগুনটা বাড়িয়ে দিন। আর ল্যাটকা খেতে চাইলে পানি বেশি দিন আর আগুনটা কমিয়ে ঢিমে আঁচে রান্না করুন। মিনিট বিশ পর তুলে ফেলুন। ফ্রিজটা খুঁজে দেখুন ইলিশ আছে কি না। ইলিশ যদি থাকে, খুব ভালো। ভেজে নিন। সঙ্গে পেঁয়াজ বেরেস্তা আর শুকনো মরিচের ভাজা। নইলে একটু আলুভর্তা করে নিন শুকনো মরিচ আর বাদামি করে ভাজা পেঁয়াজ দিয়ে। কখন দু প্লেট খেয়ে ফেলবেন, ঠিক মনে করতেই আপনার কষ্ট হবে। আচ্ছা, আপনি যদি আরও শৌখিন আর বিলাসী হয়ে থাকেন তাহলে আপনার জন্য পরামর্শ, যেকোনো মাংসের ভুনা তৈরি করার। গরু, মুরগি বা খাসি যেকোনো মাংসই হতে পারে। তবে খিচুড়ির সঙ্গে অবশ্যই ভুনা হতে হবে। আপনি যদি এসবের কিছুই খেতে না চান তাহলে আপনার জন্য ফ্রি পরামর্শ হলো রুপচাঁদা ফ্রাই খান। গরম খিচুড়ি আর রুপচাঁদার ভাজা! মুজতবা আলী কেন রুপচাঁদা নিয়ে কিছু লিখলেন না, সেটা ভেবেই আমার চোখে জল আসে মাঝে মাঝে। আরও একটি পরামর্শ দিয়ে রাখি। লইট্টা শুঁটকির ভুনাও খেতে পারেন খিচুড়ির সঙ্গে। ঝাল-লবণ একটু বেশি করে দিয়ে কড়া করে ভুনা করে ফেলুন। তারপর জমিয়ে খান। আর যদি আলস্য দোষে দুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে কী আর করবেন? সেই অধমের ডিম তো আছেই। কষ্ট করে বাটিতে ভেঙে ফেটিয়ে নিয়ে গরম তেলে ছেড়ে দিন। ব্যাস। জাস্ট দু মিনিট পর ডিম ভাজার যে ঘ্রাণটা বের হবে তাতে পাগল হয়ে যাবেন আপনি। কোনো কিছু ভাজার সহজ সমাধান হলো, প্রথমে কড়াই বা ফ্রাইপ্যান ভালো করে গরম করে নিন। তারপর তাতে তেল দিয়ে তাও ভালো করে গরম করুন। তারপর লবণ-হলুদ মাখানো মাছের পিচ কিংবা ফ্যাটানো ডিম দিয়ে দিন। কড়াই/প্যান এবং তেল ভালো করে গরম করা যেকোনো কিছু ভাজার প্রথম শর্ত। সবচেয়ে সহজে যা করতে পারেন তা হলো, বিভিন্ন ধরনের রোল এবং নাগেরই। এগুলো কিনতেই পাওয়া যায় যেকোনো মুদি দোকানে। আচ্ছা, এখন তো সুপার শপের যুগ। যেকোনো সুপার শপে খোঁজ করলেই এগুলো পেয়ে যাবেন। আপনার পছন্দমতো কিনে নিন। ডিপ ফ্রিজে রাখুন। ভাজার সময় একটু আগে বের করে রাখুন। কড়াই আর তেল গরম করে তাতে ছেড়ে দিন। শুধু খেয়াল রাখবেন যেন পুড়ে না যায়।

আমি জানি, সবাই রান্নাকে ভয় পায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, রান্না খুবই সহজ ব্যাপার। সেদ্ধ হলেই সবকিছু খাওয়া যায়—এটাই রান্নার মূল কথা। তাতে প্রয়োজনমতো লবণ-তেল-মসলা মিশিয়ে নিতে হয় শুধু। যেহেতু আপনি নিজেই খাবেন তাই যেভাবে খেতে চান লবণ-তেল আর মসলা সেভাবেই মিশিয়ে নিন। মনে রাখবেন, রান্না মানেই টেলিভিশনের জটিল রান্না নয়। আরও মনে রাখবেন, আপনার মাও শেফ ছিলেন না বা আপনার ভাবি। আর পাঁচ তারকা হোটেল ছাড়া কোথাও কোন শেফ নেই। সবাই রাঁধুনি। আর রাঁধুনি শব্দটি নিত্য স্ত্রী লিঙ্গ নয়।

লাইফ স্কিল শেখার প্রথম ধাপ রান্না শেখা। রান্না শিখলে যেকোনো পরিবেশে, যেকোনো পরিস্থিতিতে আপনার না খেয়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে না। এই বর্ষায় একটি রান্না হলেও শিখে ফেলুন। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আপনার পৃথিবী বদলে যাবে।