বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমার আশঙ্কা

image_titleনতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এটি কার্যকর...নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। এটি কার্যকর হলে বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা।তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের প্রতি সরকারের এই ঝোঁক প্রবণতা ভালো লক্ষণ নয়।

কেননা ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়া বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। আর বেসরকারি খাত চাঙ্গা না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও হবে না। বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৯ থেকে কমে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়লে এটি আরও কমবে।কেউ বলেছেন, অর্থের চরম টানাটানিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না।জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের যে টাকা নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার, তা পাস হওয়ার পাশাপাশি কার্যকর হলে ব্যাংকিং খাতে অর্থের টানাটানি প্রকট আকার ধারণ করবে। নতুন কোনো উদ্যোক্তা ঋণ পাবে না। ব্যবসায়ীদের ঋণ পেতে কষ্ট হবে। কারণ ব্যাংকের হাতে এমনিতেই টাকা নেই। বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। তার ওপর সরকার বড় অঙ্কের টাকা নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের টাকা দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো। এতে একদিকে সুদহারের লাগাম টানা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।কথা হয় ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন- অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে।তিনি যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং খাত কিছুটা চাপে পড়বে।

কারণ ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের সংকটে আছে। সরকারকে এত টাকা দেয়া কঠিন হবে। এটি কার্যকর হলে ব্যাংক ঋণের সুদ হারেও প্রভাব পড়বে।মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান যুগান্তরকে বলেন, ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানো নিয়ে এমনিতেই অনেক ব্যাংক চাপে আছে। বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ছে খুব ধীরগতিতে। সরকারি আমানত পাচ্ছে না ব্যাংক। সম্প্রতি বিটিআরসি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী যুগান্তরকে বলেন, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণগ্রহণ বাড়ালে ব্যাংকগুলো কিছুটা চাপে পড়বে। বেসরকারি বিনিয়োগ কমে আসবে। একই সঙ্গে সুদের হার আরও বাড়বে।বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সরকার ঠিক তখনই ব্যাংক ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিল যখন অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণখেলাপিদের পকেটে। আবার সে খেলাপিদের থেকে টাকা আদায়ে বাস্তবসম্মত কার্যকর কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্তের আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রভাবিত হলে কর্মসংস্থানও বিঘ্নিত হবে।সাবেক ব্যাংকার শফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার টাকা বেশি নিলে সরকারের ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে না। অর্থের টানাটানিতে সুদহার আরও বেড়ে যাবে।সূত্র বলছে, নতুন অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা ঠিক করা হয়। এর মধ্যে ১০ মাস ২৬ দিনে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাকি সময়ে সরকারের ব্যাংক ঋণ আরও অনেক বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়েছিল ১১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। ওই সময় সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল। এবার ২৭ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির টার্গেট করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক ঋণের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের ঋণের লক্ষ্য অনেক কম।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর যে অবস্থা তাতে সরকার চাইলেও টাকা নিতে পারবে না। কারণ বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। আর যদি এর মধ্যেও টাকা নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মেহমুদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এক বছর ধরে ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত টাকা নেই। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ১৯ থেকে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। তার ওপর সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ বেশি নিলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে ব্যাংক ঋণে সুদহার আরও বাড়বে। সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে থাকে। ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ঋণ নেয়, যা স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে বিবেচিত। এ ক্ষেত্রে বর্তমানে সুদহার রয়েছে সাড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মতো। আর বন্ডের মাধ্যমে সরকার দুই বছর, পাঁচ বছর, ১০ বছর, ১৫ বছর ও ২০ বছর মেয়াদি ঋণ নেয়। বর্তমানে এসব ব্যাংকের সুদহার ৬ দশমিক ৩২ থেকে ৮ শতাংশ সুদ ব্যয় করতে হয়। অবশ্য সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে সরকারকে ১১ দশমিক শূন্য ৪ থেকে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমাতে সাম্প্রতিক সময়ে টিআইএন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলকসহ নানা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ফলে সঞ্চয়পত্র নয়, এবার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেবে সরকার।।