আচারে মজিয়া মন

image_title

বরেণ্য অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের সঙ্গে পুরান ঢাকার দেবেন্দ্রনাথ দাস লেনে অফিশিয়াল কাজের সূত্রে একবার বেশ দীর্ঘ সময় আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, আচার ছাড়া তাঁর খাওয়া হয় না। অভিনয়ের সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় গেলেও যতটা সম্ভব আচার সঙ্গে নিয়ে যেতে ভুল করেন না তিনি।


পরে অনেক খুঁজে বিশ্ববরেণ্য কিছু মানুষের নাম পেয়েছিলাম, যাঁরা আচার খেতে পছন্দ করতেন।

এই তালিকায় রয়েছেন বিশ্ববিজয়ী বীর সম্রাট জুলিয়াস সিজার, তিবেরিয়াস, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, ব্রিটেনের রাজা জন ও রানি প্রথম এলিজাবেথ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন, আমেরিকার আবিষ্কারক আমেরিগো ভেসপুচি! শুধু তা-ই নয়, রানি ক্লিওপেট্রাও আচার খেতে শুধু ভালোবাসতেনই না; খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একধাপ বাড়িয়ে তিনি বিশ্বাস করতেন, আচার তাঁর সৌন্দর্য রক্ষায় সহায়তা করে! আচার খেলে সৌন্দর্য ঠিক থাকে—ক্লিওপেট্রা ছাড়া আর কারও মুখে এমন কথা শোনা যায় না অবশ্য। যা হোক, শুধু এই বিদেশিরাই আচার পছন্দ করতেন না; বাঙালির আচারপ্রীতিও এসব বিদেশির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

বাড়ির দাওয়ায় বা পাকা বাড়ির ছাদে কাচের বয়ামে সরষের তেলে ডুবিয়ে রাখা মসলা মাখানো আম, বরই বা কুল, চালতা ইত্যাদির আচার শুকানোর দৃশ্য বাঙালির আবহমানকালের। সম্ভবত আমের আচারের জনপ্রিয়তা আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি। আমের মৌসুমে বাহারি স্বাদের পাকা আম তো খাওয়া হবেই; একই সঙ্গে কাঁচা আমে তৈরি হবে আচার। তারপর সারা বছর রসিয়ে রসিয়ে খাওয়া হবে সেগুলো। তার আগে চলে আয়োজন করে আচার বানানোর পর্ব। কোন আমে কেমন আচার হয়, তার রয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত এক বিজ্ঞান। প্রধানত নারীরাই সেই বিজ্ঞানের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। কোনো কোনো পুরুষ যে সেই চাকা ঠেলতে হাত লাগাননি, তেমনটা বলা যায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন কয়েকজন পুরুষ মানুষকে চিনি, যাঁরা অসাধারণ আচার এবং লেবুর জারক তৈরি করতে পারেন। শুধু তা-ই নয়। কোন লেবুর জারকের স্বাদ কেমন হবে, কোন লেবুর আচার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যাবে, এসব খুঁটিনাটি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাঁদের নখদর্পণে।

আচার মানুষের প্রাচীনতম খাবারগুলোর অন্যতম। মূলত ফলমূল, সবজিসহ বিভিন্ন খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য এই খাবারের উদ্ভব ঘটে। ধারণা করা হয়, আচার ভারতীয় উপমহাদেশের খাবার।

এটাও বলা হয়ে থাকে, ২৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মেসোপটমিয়ান সভ্যতার সময় থেকে মানুষ আচার খাওয়া শুরু করে। আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিভিন্ন ফরম্যাটে আচারের ইতিহাস মোটামুটি চার হাজার বছরের প্রাচীন।

দক্ষিণ এশিয়ার বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন ভাষায় এটি আচার হিসেবেই পরিচিত। স্থানীয়ভাবে পাওয়া ফলমূল ও সবজির ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের ও স্বাদের আচার তৈরি হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি এবং বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরি হয় যে ফলটি দিয়ে, সেটা হচ্ছে আম। কারণ, এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে নানান জাতের আম উৎপন্ন হয়। এর পরেই আছে লেবু, আমড়া, জলপাই, আমলকী, তেঁতুল, বরই, চালতা, কামরাঙা ইত্যাদি টকজাতীয় ফল। সবজির মধ্যে শসা, গাজর, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, টমেটো, বরবটি, আলু ইত্যাদি অন্যতম। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এসব ফল ও সবজি দিয়ে আচার তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে প্রচুর আম উৎপন্ন হয়। সে কারণে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের নানা ধরনের আমের আচার ওই অঞ্চলে উৎপাদন হয় বেশি। আচার বানানো হয় কাঁচা আম দিয়ে। পুরো বাংলাদেশেই মোটামুটি বরই উৎপন্ন হয়। জনপ্রিয় আচারের মধ্যে তাই বরইয়ের আচার অন্যতম। কাঁচা এবং শুকনো দুই ধরনের বরই দিয়েই আচার তৈরি করা হয়। গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড গরমে বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত আচার খেয়ে থাকে। তবে কমবেশি সারা বছরই আচার খাওয়া হয়—খাবারের স্বাদ বাড়াতে।

বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে সাতকড়া নামে লেবুজাতীয় একধরনের ফল জন্মে। এই সাতকড়ার আচার বেশ সুস্বাদু। এই আচারের সঙ্গে গরুর মাংসের তরকারি অতি উপাদেয় খাবার। এই অঞ্চলে নাগা মরিচ উৎপন্ন হয়। এই মরিচ দিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত নাগা মরিচের আচার। উল্লেখ্য, সিলেট অঞ্চলের সাতকড়া ও নাগা মরিচের আচার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে, বিশেষত ব্রিটেনেও ভীষণ জনপ্রিয়।

এবার দেখে নেওয়া যাক আচার তৈরির অন্য উপাদানগুলো।

ফল ও সবজি ছাড়া আচার তৈরির অন্যতম উপকরণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খাবার তেল, সিরকা ও বিভিন্ন ধরনের মসলা। তেলের উপকরণের ভিন্নতার কারণে আচারের স্বাদের ভিন্নতা তৈরি হয়। অর্থাৎ সরিষার তেল দিয়ে আচার বানালে একধরনের স্বাদ হবে। আবার সয়াবিন কিংবা অলিভ ওয়েল দিয়ে আচার বানালে অন্য রকম স্বাদ হবে। একইভাবে মসলার উপকরণের ভিন্নতাও আচারের স্বাদের ভিন্নতার কারণ।

আসুন আচার প্রস্তুতপ্রণালি দেখে নেওয়া যাক।

ফল কিংবা সবজি, যা দিয়েই আচার বানানো হোক না কেন, প্রথমে সাধারণত এগুলোয় থাকা পানি শুকিয়ে নেওয়া হয় রোদে শুকিয়ে কিংবা এগুলো কেটে নিয়ে মসলা মাখিয়ে অথবা পানিতে সেদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে। তারপর এগুলোয় মসলা মাখিয়ে তেল বা সিরকায় ডুবিয়ে বয়ামে রাখা হয়। কাচের বয়ামে আচার রাখা ভালো। এতে আচার দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

আচার বানালেই শুধু হবে না; একে সঠিকভাবে সংরক্ষণও করতে হবে। সংরক্ষণের কিছু টিপস দিয়ে রাখি আপনাদের।

১. প্রথমেই বলে রাখি, সিরকা ও সোডিয়াম বেনজোয়েট দিলে আচার দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
২. ভুলেও পানি ব্যবহার করবেন না। পানি ব্যবহার করলে আচার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়।
৩. হাত দিয়ে আচার নাড়বেন না, চামচ ব্যবহার করুন। চামচ ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখুন চামচে যেন পানি না থাকে।
৪. কাচের বয়ামে আচার ভালো থাকে।
৫. মাঝেমধ্যে আচার রোদে দিন।
৬. তেলে আচার ডুবিয়ে রাখলে আচারে ফাঙ্গাস পড়ে না।
৭. তেল কম হলে তা গরম করে ঠান্ডা করে ব্যবহার করুন, এতে গন্ধ হবে না।
৮. চুনের পানি বা ফিটকিরি গোলানো পানিতে আম ভিজিয়ে রাখলে আচার তৈরির সময় আম ভেঙে যায় না।
৯. যাঁদের আচার রোদে দেওয়ার মতো জায়গা নেই, তাঁরা নিশ্চিন্তে সেটিকে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিন। সে ক্ষেত্রে সিরকা ও সোডিয়াম বেনজোয়েট না দিলেও চলবে।

এই পদ্ধতিগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আচার তৈরি এবং সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায় আছে। মূলত, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ তাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেই আচার তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। পৃথিবীর প্রাচীনতম আচারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় শসার তৈরি আচারের কথা। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ২০৩০ সালে মেসোপটমিয়ানরা শসার আচার তৈরি করেছিল তাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেই।

বলা হয়ে থাকে, আচার ছাড়া ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করতে পারতেন না। ১৪৯২ সালের আমেরিকা অভিযানে কলম্বাস তাঁর নাবিকদের রেশন হিসেবে আচার দিতেন। এই আচার তাঁদের ভিটামিন সির অভাব মিটিয়ে স্কার্ভি রোগের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল।

শুধু ফল কিংবা সবজি নয়; বিভিন্ন ধরনের মাংস, মাছ ও ডিমেরও আচার তৈরি করা হয় এগুলোকে দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ করার জন্য। বাংলাদেশে গরুর মাংস খাবারের একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। গরুর মাংসের আচার আচার বানিয়ে দীর্ঘদিন পরে খাবারের একটা প্রচলনও আছে এই দেশে। এ ছাড়া চীনে ডিমের আচার বানানো হয় আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় হাঙরের মাংস দীর্ঘদিন পরে খাওয়া হয় মূলত আচার বানিয়ে।

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে আচার তৈরি হলেও আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ২০০১ সালে বার্ষিক আচার দিবস পালন করা হয়।

চলছে আমের মৌসুম। কাঁচা আম দিয়ে বানিয়ে ফেলুন বিভিন্ন স্বাদের আচার। আর প্রাণভরে উপভোগ করুন সারা বছর। আচার খেতে কোনো দিবস প্রয়োজন হয় না। আচারে একবার মন মজে গেলে কাঁঠালের আঠার মতো জিবের সঙ্গে লেগে রইবে সারা জীবন, তা সে যা দিয়ে তৈরি করা হোক না কেন।