দেড় মাস পর ফিরলেন শিক্ষক মুবাশ্বার

নিখোঁজ হওয়ার দেড় মাস পর ঘরে ফিরলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মুবাশ্বার হাসান সিজার। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকে কে বা কারা তাকে রাজধানীর বিমান বন্দর এলাকায় নামিয়ে দিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে একটি সিএনজি নিয়ে তিনি রাজধানীর বনশ্রীর বাসায় পৌঁছান। তবে উত্পলের মত মুবাশ্বারও বললেন, টাকার জন্য তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। এর আগে অপহরণের ৭০ দিন পর গত মঙ্গলবার ফিরে আসেন সাংবাদিক উত্পল দাস।এ দিকে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় মাস দিন ঘণ্টা অতিবাহিত করার পর দু’দিনের ব্যবধানে নিখোঁজ থাকা শিক্ষক ও সাংবাদিক ফিরে আসায় আনন্দের বন্যা বইছে তাদের পরিবারে। এ আনন্দের রেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সহকর্মী, বন্ধু, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের ফিরে আসার খবরে আসায় বুক বাঁধছেন নিখোঁজ থাকা অন্য হতভাগ্যের স্বজনরাও। তাদের অনেকেই এখন আশা করছেন বিলম্বে হলেও তাদের নিখোঁজ স্বজনরাও ফিরে আসবেন। এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে মুবাশ্বারের বোন তামান্না তাসমিন ফেসবুকে লিখেন- ‘আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে গতকাল রাত ১টায় আমার ভাইয়া সুস্থ অবস্থায় বাসায় ফিরেছে।’যেভাবে অপহরণগতকাল সকালে রামপুরার বনশ্রীর বাসায় অপহরণের দিনের বর্ণনা দিয়ে মুবাশ্বার হাসান বলেন, ঘটনার দিন ইউএনডিপির একটি অনুষ্ঠান শেষে তিনি বনশ্রীর বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় তিনি উবারের একটি গাড়িতে করে রোকেয়া সরণির দিকে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে বসে আপন মনে তিনি নিজের মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করছিলেন। হঠাত্ এক ব্যক্তি সিগন্যাল দিয়ে তার গাড়ি থামিয়ে দেন। গাড়ি থামার পরপরই ওই ব্যক্তি বলেন, গাড়িটি চোরাই গাড়ি, তুমি দ্রুত গাড়ি থেকে নামো। এর পর পেছন থেকে কোনো এক ব্যক্তি তার চোখে মলম লাগিয়ে দেয়। একই সঙ্গে পেছন থেকে জোরে মুখ চেপে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি।গত দেড় মাসের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মুবাশ্বার বলেন, ‘ময়লা তোশক, জানলা আছে বাইরে থেকে সিল করা। ওই সাইডে একটা রুম আছে সেখানে ৪/৫ জন কথা বলছে। আমি অনেকদিন পর দিনের আলো দেখছি।’কেন অপহরণ করা হয়েছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে মুবাশ্বার বলেন, ‘মূল বিষয়টা হচ্ছে টাকা পয়সাই, ওরা হয়ত বুঝে নাই। আমরা নরমাল ফ্যামিলি, এরা হয়ত প্রোফাইলটা বুঝতে পারে নাই। একটা সময় বলেছিল- তুই তো অনেক জায়গায় কাজ করস টাকা কোথায়? আমার কাছে ২৭ হাজার টাকা ছিল, তা ওরা নিয়ে নিয়েছে। ক্রেডিটকার্ড সেদিন আমি নিইনি। এদের মধ্যে তর্কবির্তক ছিল একটা জিনিস নিয়ে- একে কি ছাড়ব, না মারব? কোনো একটা ব্যাপারে আমার ধারণা হয়েছে, ওদের মধ্যে কেউ মিসিং একটা কিছু হয়েছে, ওরা খুবই ভয় পেয়েছে। মাঝখানে একটা কথা বলেছিল- ‘টাকা পয়সার ব্যাপারে তোর ফ্যামিলি বা বড় কেউ আছে কিনা, ফোন দে। বেসিক্যালি হয়েছে কি, কিডন্যাপ না হলে বুঝা যাবে না বিষয়টা কতটুকু আনরিয়েল।অপহরণকারীদের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের ব্যাপারে মুবাশ্বার বলেন, যতটুকু মনে আছে, হোটেল থেকে দিত ঠাণ্ডা খাবার। এরা মুক্তিপণ চায় বা চায় না আই ডোন্ট নো, আমার সাথে কথা হয় নাই, একদিন হয়ত তোমাদের (পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে) ফোন দিয়েছিল। কী ডিসকাশন হয়েছিল আই ডোন্ট নো। জিনিসটা —- মানুষের জীবনের কিছু মিস্ট্রি থাকে, সমস্যাটা হয়েছে- কিছু দেখতে পাই নাই।এ সময় সাংবাদিকরা আরো প্রশ্ন করতে থাকলে সিজারের বাবা মোতাহার হোসেন বলেন, ও এত কিছু কথা বলতে পারবে না, ও মাথায় —- অসুস্থ আমি বলছি। তিনি আরো বলেন, আগামীকাল (আজ শনিবার) মুবাশ্বারের শারীরিক পরীক্ষার জন্য তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।তখন মুবাশ্বার হাসান বলেন, আমি আসার পর দেখছি মিডিয়া অনেক হেল্প করেছে, আমার শিক্ষকরা মানববন্ধন করেছে। আমাকে নিয়ে ছোটভাই বড়ভাই, প্লিজ দোয়া করবেন। (আমরা) নরমাল ফ্যামিলি, সাইক্লোনের মতো একটাই গেছে, আমাদের সবার জন্য দোয়া করবেন।যেভাবে ফিরলেনঅপহরণের পর বাড়িতে ফেরার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুবাশ্বার হাসান বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে তার চোখ বেঁধে একটি গাড়িতে তুলেছিল অপহরণকারীরা। এরপর তাকে বিমানবন্দর সড়কের কোনো এক জায়গায় চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় অপহরণকারীরা। তারা বলে, তুই চলে যা। পেছনের দিকে তাকালে মেরে ফেলব।গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর একটুখানি স্বাভাবিক হয়ে সেখান থেকে একটি সিএনজি ঠিক করে বাসায় রওনা দেন মুবাশ্বার। রাত ১টার দিকে তিনি বাসায় ফেরেন।মুবাশ্বারের বোন তামান্না তাসনিম বলেন, বৃহস্পতিবার (গত পরশু) রাত ১টার দিকে তার ভাই সিএনজিতে করে বাসায় ফেরেন। ফেরার সময় বাসার নম্বরে ফোন করে জানান, তার কাছে সিএনজি ভাড়া নেই, তাই ভাড়া নিয়ে কেউ যেন বাসার নিচে আসেন। তামান্না বলেন, বাসায় ফেরার পর ভাইয়াবে অনেকটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল।খিলগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মশিউর রহমান বলেন, সিজার ফিরে আসার বিষয়টি তার পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতেই আমাদের জানানো হয়েছে। পুলিশ এখনো সিজারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথা বলেনি। একটু সুস্থ ও স্বাভাবিক হলেই তার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলা হবে।নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড স্যোশিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুবাশ্বার হাসান সিজার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন মুবাশ্বার। একসময় সাংবাদিকতাও করেছেন। পরে যুক্তরাজ্যে মাস্টার্স ও অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করেন তিনি। মুবাশ্বার হাসান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পেও কাজ করতেন। ধর্ম ও জঙ্গিবাদ নিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পেও যুুক্ত ছিলেন তিনি। গত ৭ নভেম্বর সকালে রামপুরার বনশ্রীর বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বের হন তিনি। পরে আর বাসায় ফেরেননি।উত্পল ও সিজার ছাড়াও গত এক বছরে ঢাকায় ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কূটনীতিক মিলিয়ে ১০ জনেরও বেশি নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সবশেষ ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিদেশ থেকে আসা মেয়েকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কূটনীতিক মারুফ জামান। তারও কোনো খোঁজ মিলছে না।