আয়ারল্যান্ডে ইসলাম ও মুসলমান

উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন। এর আয়তন ৩২ হাজার ৫৯৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৪৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৬৫ জন। আয়ারল্যান্ড একটি উন্নত দেশ, যার জিডিপির আকার ৩৪৫ বিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ৭২ হাজার ৬৩২ মার্কিন ডলার। পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আয়ারল্যান্ডেও রয়েছে মুসলিম অধিবাসী। পশ্চিমের অন্যান্য দেশের চেয়ে এখানে কম বয়সের মুসলমানের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ২০০৬ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৩ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকের মতে, প্রকৃত মুসলিম অধিবাসী ৪০ হাজারের বেশি বলে জানা গেছে। এক তথ্য মতে, ২০০২ ও ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময় আয়ারল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ৭০ শতাংশেরও বেশি। এই হিসাবে দেশটির সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ধর্ম হলো ইসলাম।আয়ারল্যান্ডের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে নানা বর্ণ ও এলাকার সমাবেশ লক্ষ করা যায়। অতীতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে এখানে মুসলমানদের আগমন ঘটে। শিক্ষার প্রয়োজনে অথবা জীবিকার সন্ধানে মুসলমানরা এখানে আসে। তাদের অনেকেই দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে। অনেকে আবার আইরিশ মেয়েদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আয়ারল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করে। ১৯৯০ সালের শুরুতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও বলকান এলাকা থেকে মুসলমানরা আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমায়।এর মধ্যে অনেকেই অভিবাসী এবং অন্যরা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রত্যাশী। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে নাইজেরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, সোমালিয়া, আলজেরিয়া ও অন্যান্য দেশের মুসলমানরা রয়েছেন। আইরিশ অধিবাসীদের মধ্য থেকে কিছু নও মুসলিমও সেখানে রয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের মুসলিম জনসংখ্যার বেশির ভাগই সুন্নি মতাবলম্বী। দেশটির রাজধানী ডাবলিনে অনেক শিয়া মতবাদের মুসলমানও আছেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো এখানকার ধর্মীয়ভাবে বিভাজিত গোষ্ঠীর মধ্যে তেমন কোনো সমস্যা নেই। এখানকার নানা জাত, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে সুন্দর ও অনাবিল সম্পর্ক বিদ্যমান।আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে মুসলমানদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আছে, যার নাম ইসলামিক কালচারাল সেন্টার অব আয়ারল্যান্ড । এটি চার একর জমির ওপর অবস্থিত একটি কমপ্লেক্স। এখানে একটি স্কুল আছে। কমপ্লেক্সটি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দুবাইয়ের উপশাসক ও আরব আমিরাতের অর্থমন্ত্রী শেখ হামদান বিন রাশিদ আল-মাকতুম পরিচালিত আল-মাকতুম ফাউন্ডেশন -এর জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে। মাকতুম পরিবারের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ডাবলিনের এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ২০ জন কর্মকর্তা কর্তব্যরত আছেন, যাঁরা বেশির ভাগই আরব অধিবাসী। তাঁদের যাবতীয় খরচ আল-মাকতুম ফাউন্ডেশন বহন করে। কেন্দ্রটির পরিচালক হলেন ড. নুহ আল-কাদ্দু। তিনি ইরাকের অধিবাসী। কেন্দ্রটি পরিচালনা করার জন্য জনাব নুহ ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন থেকে ডাবলিনে গমন করেন। আয়ারল্যান্ডের বেশির ভাগ মুসলমান কালচারাল সেন্টারটিকে ইখওয়ানি মসজিদ বলে উল্লেখ করে থাকেন। ইখওয়ান আরবি শব্দ, যেটি মিসরের ইসলামী আন্দোলন ব্রাদারহুড নামে পরিচিত। তবে আয়ারল্যান্ডে ব্রাদারহুডের মনোভাবাপন্ন অনেক মুসলমান আছেন, যাঁরা শুধু এখানেই নয়, সারা ইউরোপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং তাঁরা ইসলামের কাজে অগ্রসর ভূমিকা পালন করছেন।ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের যে মসজিদ, তার ইমাম হচ্ছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত হুসেইন হালাওয়া। তিনি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চে র সেক্রেটারি জেনারেল। এই প্রতিষ্ঠানে অনেক ইসলামী পণ্ডিত জড়িত আছেন, যাঁরা ইউরোপের মুসলমানদের ব্যক্তিগত বিষয় বা কোনো ধর্মীয় সমস্যার সমাধানে ফতোয়া দিয়ে থাকেন। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চের ভূমিকার কারণে এই সংস্থা গোটা ইউরোপে একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।উল্লেখ্য, মিসরীয় ইসলামী পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ ইউসুফ আল-কারজাভি ইউরোপীয় কাউন্সিল গঠন করেন। তিনি কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আলজাজিরার একটি আরবি ইসলামিক অনুষ্ঠানের পরিচালক। ইউসুফ আল-কারজাভি বহুবার আয়ারল্যান্ড সফর করেন এবং ইসলামী দাওয়াহ কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব বলে জানা গেছে। ২০১০ সালে প্রকাশিত পিও ফোরাম অন রিলিজিয়াস অ্যান্ড পাবলিক লাইফে র এক তথ্য মতে, ইউরোপে প্রায় ৪০০ মসজিদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপের বেশির ভাগ সংগঠনের সঙ্গে ব্রাদারহুড কাজ করছে এবং তারা ইউরোপের সরকারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছে। আর একই পরিস্থিতি রয়েছে আয়ারল্যান্ডেও।আয়ারল্যান্ডে ইসলাম বিষয়ে তিন বছরের একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন ড. অলিভার স্কারব্রট। তাঁর মতে, ইসলামিক কালচারাল সেন্টার অব আয়ারল্যান্ড এবং আইরিশ কাউন্সিল অব ইমামস দেশটির মুসলমানদের কাছে খুবই পরিচিত। তবে এসব সংস্থার সঙ্গে মুসলমানদের অফিশিয়াল কোনো সম্পর্ক নেই। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কালচারাল সেন্টারসহ অন্যান্য সংস্থার ব্যাপারে আয়ারল্যান্ডের কারো কারো বা কোনো গ্রুপ থেকে প্রশ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে। তার পরও সেখানে মুসলমানরা কাজ করে যাচ্ছেন।২০০৯ সালে সৌদি সরকার আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে তাদের দূতাবাস খুলেছে। ফলে দেশটিতে মুসলমানদের জন্য একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা ডাবলিনে একটি স্কুল ও একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন। ব্লানচারড টাউনে অবস্থিত আল-মোস্তফা ইসলামিক সেন্টারের ইমাম ওমর কাদরি বলেন, যদি স্কুল ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে এটি হবে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর ফলে আয়ারল্যান্ডে একটি বড় প্রভাব পড়বে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আয়ারল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। মুসলমানরা সেখানে আরো সংহত ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমরা আশা করি, ইসলামের কাজ ধীরে হলেও আয়ারল্যান্ডে বিস্তার লাভ করবে। আগামী দিনগুলোতে দেশটিতে মুসলমানরা আরো বেশি প্রভাব বিস্তার করুক—এই প্রত্যাশাই আমরা করছি।লেখক : শিশুসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড