পানাহারের শিষ্টাচার এবং নিয়মাবলী

মানুষের বেঁচে থাকতে হলে খেতে হয়। আল-কুরআনে আল্লাহ তা আলা তার বান্দাদেরকে পবিত্র এবং হালাল খাদ্য খেতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব না খেয়ে বৈরাগ্যবাদ পালন করা নিষেধ। তাছাড়া খাদ্য আল্লাহর বিশেষ নিআমত। কেউ বানাতে তা পারে না। গাছের ফল দেন আল্লাহ। মানুষের কোন হাত নেই। জমীনে ফসল ফলান , সাগরে নদীতে মাছ দেন তিনিই, মানুষের কোন হাত নেই। এজন্য তার নির্দেশ মোতাবেক পানাহার করে এবং নবীজির সুন্নাত অনুযায়ী পানাহার করে আল্লাহর নেআমতের শুকরিয়া আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।তাছাড়া আল্লাহর বান্দাদের উপর যতগুলি অনুগ্রহ আছে তার মাঝে অন্যতম প্রধান অনুগ্রহ হল পানাহারের ক্ষমতা। এ ক্ষমতা যখন তিনি কারো থেকে উঠিয়ে নেন তখনই অনুভব করা যায়। মানুষের শরীর গঠন,বর্দ্ধন ও টিকে থাকার মূল উপাদান হচ্ছে পানাহার। এই নেয়ামতের দাবি হল এর দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আর এ কৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তাঁর দেয়া বিধান পালন করার মাধ্যমে আদায় হতে পারে। এ নেয়ামতের আরো একটি দাবি হচ্ছে, এর সহায়তায় আল্লাহর নাফরমানি করা যাবে না।পানাহারের অনেকগুলো আদব বা শিষ্টাচার রয়েছে। যেমন: খাদ্য এবং পানীয় জাতীয় জিনিসের ভক্তি ও কদর করা আর এই বিশ্বাস রাখা যে এগুলি আল্লাহর নেয়ামত যা আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়েছেন। খাদ্য জাতীয় জিনিসকে অবহেলা-অসম্মান না করা; ডাস্টবিন ও ময়লা আবর্জনার ভিতরে না ফেলা।খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা একান্তই জরুরী। হাদীসে যে ব্যক্তি পানাহারের সময় বিসমিল্লাহ বলবে না তার পানাহারে শয়তান শরীক হওয়ার কথা বলা হয়েছে।হাদীসে এসেছে, আমর বিন আবু সালামা থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন : হে বৎস বিসমিল্লাহ বল এবং ডান হাত দিয়ে খাও। আর খাবার পাত্রের যে অংশ তোমার সাথে লাগানো সে অংশ থেকে খাও।হাদীসে আরো এসেছে, হুযাইফা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, শয়তান ঐ খাবারকে নিজের জন্য হালাল মনে করে যার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হয় নি। (মুসলিম : ৩৭৬১)খাবার পাত্রের যেদিক তার সাথে লাগানো সেদিক থেকে খাবে। আর খাবার যদি বিভিন্ন ধরনের হয় তা হলে অন্যদিক – যা তার সাথে লাগোয়া নয়- থেকে খাওয়াতে কোন দোষ নেই।খাবারের আরেকটি শিষ্টাচার হলো, যদি খাবারের কোন লোকমা পড়ে যায় তবে উঠিয়ে খাবে, যদি ময়লা লাগে ধুয়ে ময়লা মুক্ত করে খাবে। কারণ এটিই সুন্নত এবং এর মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহর নির্দেশের অনুসরণ করা হবে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যদি তোমাদের কারো খাবারের লোকমা পড়ে যায় তবে তার থেকে ময়লা দুর করবে এবং তা খেয়ে ফেলবে, শয়তানের জন্য রেখে দেবে না। ( মুসলিম ৩৭৯৪) আরেকটি নিয়ম হলো, খাবারের প্লেট পরিষ্কার করা এবং তার ভিতর যা কিছু থাকবে মুছে খাওয়া। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, জাবের রা. থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙুল এবং খাবার পাত্র চেটে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন তোমরা জানো না কোন লোকমাতে বরকত রয়েছে। ( মুসলিম ৩৭৯২)খাবারের আরেকটি আদব হলো আঙুল ধোয়ার পূর্বে চেটে খাওয়া। হাদীসে এসেছে, কা ব বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি তিন আঙুল দিয়ে খাচ্ছেন এবং খাওয়া শেষে আঙুল চেটে খাচ্ছেন। (মুসলিম : ৩৭৯০)হাদীসে আরো এসেছে, আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, যখন তোমরা কেউ খাবার খাবে তার উচিত আঙুল চেটে খাওয়া কেননা সে জানে না কোন আঙুলে বরকত রয়েছে। (মুসলিম : ৩৭৯৩)তবে আঙুল চেটে খাওয়াকে অপছন্দ করা ও একে অভদ্রতা মনে করা যাবে না। তবে হ্যাঁ খাওয়ার মাঝখানে আঙুল চেটে খাওয়া উচিত নয়। কেননা আঙুল আবার ব্যবহার করতে হবে আর আঙুলে লেগে থাকা লালা ও থুতু প্লেটের রয়ে যাওয়া খাবারের সাথে লাগবে আর এটি এক প্রকার অপছন্দনীয়। খাবারের প্রশংসা করা মুস্তাহাব, কেননা এর মাধ্যমে খাবার আয়োজন ও প্রস্তুত কারীর উপর একটা ভাল প্রভাব পড়বে। সাথে সাথে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো এমন করতেন― عن جابر رضي اللّه عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم سأل أهلَه الأدُمَ، فقالوا: ما عندنا إلا خلّ، فدعا به، فجعل يأكل به، ويقول: ্রنعم الأدُم الخلّ، نعم الأُدُم الخلগ্ধ. مسلم (৩৮২৪)জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পরিবারের নিকট তরকারী চাইলেন। তারা বললেন, আমাদের কাছে সিরকা ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি সিরকা আনতে বললেন এবং তার দ্বারা খেতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, সিরকা কতইনা উত্তম তরকারী; সিরকা কতইনা উত্তম তরকারী। (মুসলিম : ৩৮২৪)পান করার শিষ্টাচার : পানি পান কারীর জন্য সুন্নত হল:তিন শ্বাসে পান করা। একটু পান করার পর পাত্র মুখ থেকে দুরে সরিয়ে নিয়ে শ্বাস নিবে। অতঃপর দ্বিতীয়বার এরপর একই ভাবে তৃতীয়বার। যেমন আনাস রা.-এর হাদীসে এসেছ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার মাঝে তিনবার শ্বাস নিতেন। মুসলিম শরীফের অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলতেন: এইভাবে পান করা অধিক পিপাসা নিবারণকারী অধিক নিরাপদ অধিক তৃপ্তিদায়ক। (বুখারি : ৫২০০, মুসলিম : ৩৭৮২ )পানাহারের শেষে আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ তাঁর প্রশংসা করবে।তাছাড়া প্রয়োজন ছাড়া বাম হাতে খাওয়া হারাম। বাম হাতে খাওয়ার ব্যাপারে হাদীসে সুস্পষ্টভাবে এসেছে, তোমরা বাম হাতে খেয়ো না, কেননা শয়তান বাম হাতে খায়।ডান হাতে খাওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে, তোমরা কেউ যখন খাবে ডান হাতে খাবে যখন পান করবে ডান হাতে পান করবে, কেননা শয়তান বাম হাতে খায়। বাম হাতে পান করে। (মুসলিম : ৩৭৬৩ )দাঁড়িয়ে পানাহার করা মাকরূহ, সুন্নত হল বসে পানাহারকার্য সম্পন্ন করা।হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। কাতাদাহ রা. বলেন : আমরা বললাম তাহলে দাঁড়িয়ে খাওয়ার হুকুম কি ? আনাস বললেন সেটাতো আরো বেশি খারাপ আরো বেশি দূষণীয়। (মুসলিম : ৩৭৭২ )কোন কিছুর উপর হেলান দিয়ে আহার করা মাকরূহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি হেলান দিয়ে আহার করি না।খাওয়ার পাত্রে ফু দেয়া এবং তার ভিতর নি:শ্বাস ফেলা মাকরুহ। ইবনে আব্বাস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার পাত্রে ফু দেওয়া বা শ্বাস ফেলতে নিষেধ করেছেন।( তিরমীযি : ১৮১০ )হাদীসে আরো এসেছে, আবু কাতাদাহ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণন করছেন :তোমাদের কেউ যেন প্র¯্রাব করার সময় পুরুষাঙ্গ ডান হাত দ্বারা স্পর্শ না করে এবং ডান হাত দ্বারা যেন ইস্তেনজা না করে। অনুরূপ খাবার পাত্রে যেন শ্বাস না ফেলে। (মুসলিম : ৩৯২) তাছাড়া খাবারের আরেকটি বড় শিষ্টাচার যা সাধারণত বেশী হয়ে থাকে। তা হলো খাবারের দোষ বের করা ও প্রকাশ করা। একাজ করা মাকরূহ। বরং আগ্রহ হলে খাবে, মনে না চাইলে দোষ ধরা ব্যতীত বাদ দেবে। قال أبو هريرة رضي الله عنه: ما عاب رسول الله ৎ طعاماً قط، كان إذا اشتهى شيئاً أكله، وإن كرهه تركهগ্ধ. البخاري (৪৯৮আবু হুরাইরা রা. বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও কোন খাবারের দোষ বের ও বলাবলি করেননি, মনে চাইলে খেতেন। অপছন্দ হলে রেখে দিতেন।( বুখারি ; ৪৯৮ )