দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় চাপে মানুষ

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাজধানীর শান্তিনগর বাজারে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ ইমতিয়াজ। মাসের শেষ সপ্তাহ বলে হাতে বেশি টাকা আনতে পারেননি। তবুও আশা করেছিলেন প্রয়োজনীয় সব পণ্যই কিনে বাসায় ফিরবেন। কিন্তু তিনি বাজারে এ দোকান ও দোকান হাঁটছেন আর পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করছেন। পণ্য আর কেনা হচ্ছে না। কারণ বাজারে অধিকাংশ পণ্যের দাম আকাশ ছোঁয়া। কোনটা কিনবেন আর কোনটা বাদ রাখবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। রাজধানীর বাজারগুলোতে ঢুকলেই আরিফ ইমতিয়াজের মতো অসংখ্য নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষ চোখে পড়ে। সিদ্ধান্তহীনতায় তারা শুধু বাজারের গলিতে পায়াচারি করেন। দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় চাপ তারা যেন আর নিতে পারছেন না।কথা হয় আরিফ ইমতিয়াজের সঙ্গে, তিনি বলেন, যে হারে পণ্যের দাম বাড়ছে তাতে আমাদের মতো চাকরিজীবীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা এখন আমাদের। দুই কেজি পেঁয়াজ যদি ১৬০ টাকা আর এক কেজি কাঁচা মরিচ যদি ১৭০ টাকায় কিনতে হয় তাহলে আর পণ্য কিনব কীভাবে? গরুর মাংস তো উপলক্ষ ছাড়া কেনাই হয় না। তবে ইলিশের দাম একটু কমে যাওয়ায় ভালো লাগছে। তিনি বলেন, চালের দাম এক সপ্তাহে ১৫ টাকা বেড়ে যায়, এরপর এত উদ্যোগের কথা শুনলাম, কিন্তু ফল হিসেবে দাম কমেছে সামান্যই।আরিফ ইমতিয়াজের কথার সত্যতা পাওয়া যায় বাজার ঘুরলেই। এক মাস আগেও যে দেশি পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে তা গতকাল বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে। আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে। গত সপ্তাহেও দেশি পেঁয়াজ ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে পাওয়া গেছে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতে পেঁয়াজের দাম বেশি। তার প্রভাবে দেশি-বিদেশি সব ধরনের পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া দেশে এ বছর টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণেও পেঁয়াজের দাম বেশি। শীতকালীন কাঁচা পেঁয়াজ না আসা পর্যন্ত এ দাম আর কমার সম্ভাবনা দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। এদিকে চালের দাম নিয়ে অস্বস্তি কাটছে না ভোক্তাদের। ধীরে ধীরে চালের দাম কমছে দাবি করা হলেও পাড়া-মহল্লায় এখনো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে চাল। কেজিতে ২-৩ টাকা কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। মোটা চাল এখনো বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে। দাম বৃদ্ধির আগে এটি বিক্রি হয়েছিল ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। এরপর এক ধাপে দাম বেড়ে হয় ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছিল ১৪ টাকা। এরপর নানা উদ্যোগের পরে তা কমেছে ৪ টাকা। একইভাবে চিকন চাল দাম বাড়ার আগে ছিল ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। দাম বেড়ে হয়েছিল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। অর্থাৎ দাম বেড়েছিল ১৮ টাকা। কিন্তু নানা উদ্যোগের পরে ৫ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে।রাজধানীবাসীর আরেক অস্বস্তির কারণ সবজির উচ্চমূল্য। উত্তরাঞ্চলে এবার বড় বন্যা হওয়ায় মূলত সবজির সরবরাহে ঘাটতি হয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণেও অনেক এলাকায় এবার সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। তবে শীতের সবজি আসা শুরু হওয়ায় দাম কিছুটা কমছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও তার হার খুবই কম বলে আশ্বস্ত হতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। এরমধ্যে সম্প্রতি হঠাৎ বেড়ে যায় কাঁচা মরিচের দাম। তিন সপ্তাহ আগে এক কেজি কাঁচা মরিচ ২৫০ টাকা থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গতকাল তা বিক্রি হয় ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে। রাজধানীতে মানুষ সারাবছর ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে মরিচ খেয়ে অভ্যস্ত। এদিকে বাজারে শীতের আগাম শিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে। টমেটোর দাম নেয়া হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা প্রতিকেজি। বেগুনসহ অন্যান্য সবজি এখন ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।এদিকে মাছের বাজার এখন ইলিশময়। একমাত্র এখানে এসেই যেন মানুষ তৃপ্তির হাসি হাসছেন। কারণ এক হালি ইলিশ তারা কিনতে পারছেন আকারভেদে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকায়। তবে অন্যান্য মাছের দাম আগের মতোই রয়েছে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা।দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় অবস্থা নিয়ে কথা হয় কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, চালের সংকট ধীরে ধীরে কমছে। সরকার যদি আট থেকে ১০ লাখ টন চাল মজুদ করতে পারে তাহলে চালের দাম কেজিতে ৪০ টাকায় নেমে আসবে বলে আমরা ধারণা করছি। এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগী হতে হবে। আর পেঁয়াজ ও সবজির যে সংকট তা সাময়িক। সরকারের উচিত সরবরাহ যেন স্বাভাবিক থাকে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে আরেকটি উদ্যোগ নিতে হবে। সেটি হলো সবজির স্টোরেজ ব্যবস্থা। আলুর মতো সবজি যদি আমরা সংরক্ষণ করতে পারতাম তাহলে কোনো ক্রাইসিস তৈরি হতো না। গোলাম রহমান বলেন, আমরা আরেকটি বিষয়ে সরকারকে অনুরোধ করবো, সেটি হলো- আপাতত সবজি রফতানি সীমিত কিংবা স্থগিত রাখা হোক। সবজির ভরা মৌসুমেই কেবল এটি রফতানির সুযোগ রাখা হোক।