কক্সবাজারে নিত্যপণ্যের সংকট, বেড়েছে দাম

একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন মুজিবুর রহমান। তার পাঁচ সদস্যের সংসার। থাকেন কক্সবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্র টেকপাড়ায়। বাসা ভাড়া, ঘর খরচ ও বাচ্চাদের পড়ালেখর খরচÑ চাকরির বেতন দিয়ে সামাল দিতে পরতেন। কিন্তু দিনে দিনে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তার সংসারে টান পড়েছে। বিশেষ করে চাল, মাছ, তরিতরকারি ও শাক-সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় টানাটনির শুরু।তিনি বলেন, কয়েকমাস ধরে এই অবস্থা চলছে। তবে বিগত একমাস ধরে এর মাত্রা আরো বেড়েছে। এখন বাজারে গেলে চাহিদা মতো মাছ, তরিতরকারি ও শাক-সবজি পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তা বিগত এক মাস আগের চেয়ে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। বিক্রেতাদের ভাষ্যÑ রোহিঙ্গারা আসায় কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে উৎপাদিত মাছ, তরিতরকারি ও শাক-সবজি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে যাচ্ছে। তাই সংকট আর দাম বেড়েছে।’ মুজিবুর রহমানে কথার সত্যতা জানতে গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজার শহরের কয়েকটি কাঁচা বাজার ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। শহরের পিটিস্কুল বাজারে দেখা গেছে, আগের মতো মাছ বাজারে দেখা মিলেনি। মাছ, তরিতরকারি ও শাক-সবজির বাজারেও অর্ধেকের কাছাকাছি পণ্য দেখা যায়নি। যা পাওয়া যাচ্ছে তার দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। একই ভাবে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন দীর্ঘ দিনের পুরোনো বাজারেও মেলে একই চিত্র। যে বাজারটি দিনের বেলায় ক্রেতা ও বিক্রেতার পদভারে সরগরম থাকত সেই বাজারে যেন নেমেছে নীরবতা। যেখানে আগে মিলতো হরেক রকমের মাছ ও তরিতরকারি সেখানে শুধুমাত্র তিনজন মাছ বিক্রেতা আর পাঁচজনের মতো তরকারি বিক্রেতা পাওয়া গেছে। শুটকির পসরা দেখা গেছে পাঁচটির মতো। যেসব পণ্যের পসরা বসেছে তার দাম প্রায় দিগুণের কাছাকাছি।বাজারের তরকারি বিক্রেতা আবুল হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘ দিন ধরে কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন এই বাজারে তরকারি বিক্রি করে আসছেন। উখিয়ার মরিচ্যা ও রামুর ঈদগড়, গর্জনিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে এই তরিতরকারি গুলো পাইকারী আনতেন তিনি। কিন্তু এখন মরিচ্যা থেকে কোনো কাঁচা পণ্য পাচ্ছেন না তিনি। পেলেও পাইকারী দাম শহরের খুচরা দামের চেয়ে বেশি। এই দামে কিনে গাড়ি ভাড়া দিয়ে কক্সবাজার শহরে এনে বিক্রি করা যাবে না। তাই মরিচ্যা থেকে কোনোভাবে পাইকারীভাবে কাঁচাপণ্য আনা সম্ভব হচ্ছে না। রামুর ঈদগড়, গর্জনিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়িতেও দাম বাড়তি। তবে মরিচ্যার চেয়ে কিছুটা কম। তাই সেখান থেকে পণ্য আনছেন আবুল হোসেন। তবে চাহিদা মতো পাওয়া যাচ্ছে না। তাই শুধু মাত্র আলু, বরবটি, ঝিঙা, লালশাকÑ এই চারটি পণ্য পেয়েছেন তিনি। আর কোনো পণ্য পাওয়া যায়নি সেখানে।একই কথা জানিয়ে অপর তরকারি বিক্রেতা শহীদুল্লাহ জানান, তার বাড়ি উখিয়ায়। মরিচ্যা থেকে পাইকারী সবজি এনে তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ককক্সবাজার শহরে সওদা করছেন। কিন্তু এখন মরিচ্যায় কাঁচা পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক পাইকাররা আগেই অগ্রিম টাকা দিয়ে চাষীদের কাছ থেকে সব পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তাও বেশি দামে। তারা যে দামে পাইকারী ক্রয় করছে তা শহরে খুচরাও বিক্রি করা যাচ্ছে না। তবে দামের চেয়ে বড় সমস্যা পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না।মাছের বাজারেও বিরাজ করছে একই চিত্র। কক্সবাজার শহরে এখন ছোট মাছ মোটেও মিলছে না। বড় মাছ কিছুটা মিললেও তার দাম অনেক চড়া। মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, বঙ্গোপসাগর থেকে আহরণ করা সব ধরনের ছোট মাছ উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে যাচ্ছে। সেখানে ছোট মাছের অনেক চাহিদা।জানা গেছে, নতুন করে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার নিত্যপণ্যের যোগান দিতে গিয়ে কক্সবাজার জেলা জুড়ে মাছ ও তরকারির বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। সব এলাকায় মাছ ও তরকারির মারাত্মক সংকট চলছে। উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থা আরো মারাত্মক। সেখানে স্থানীয়রা নিত্যপণ্য কিনতেই পারছে না। রোহিঙ্গাদের কারণে চাহিদা বাড়ায় এই দু’উপজেলায় নিত্যপণ্যের দাম এখন অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে মাছ, তরকারি ও চালের দাম বেশি বেড়েছে।এভাবে পণ্যের সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ায় নিš§মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের লোকজনের চরম সমস্যা চলছে। তাদের এখন আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি কোনোভাবেই মিলছে না। এতে তাদের দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। দেখা দিয়েছে অভাব-অনটন।সচেতন লোকজন বলছেন, বর্তমানে কক্সবাজারে আট লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এই সংখ্যা জেলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সব দিক দিয়ে কক্সবাজারের স্থানীয় লোকজনের মধ্যে প্রভাব ফেলবে। এর প্রভাবে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে উঠবে। এসব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে না পারলে ভবিষ্যতে তা স্থানীয়দের জীবনযাত্রাকে রুদ্ধ করে দেবে।