আবারও রোহিঙ্গা স্রোত

কয়েক দিন বিরতির পর আবারও রোহিঙ্গা স্রোত নেমেছে বাংলাদেশে। গত দুই দিনে অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।এ নিয়ে গত এক মাসে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাসূত্রের দাবি। বিশেষ করে উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া, টেকনাফের হোয়াইক্যং, লম্বাবিল ও শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে এসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের সরকারি দলের প্রধান অং সান সু চির প্রতিশ্রুতিমূলক বক্তব্যের পরও সেখানে কমেনি নৃশংসতা। উল্টো আরও বহুগুণে নৃশংসতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সদ্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা। এখনো আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা পাড়াগুলোয় জ্বলছে আগুন। চলছে সেখানকার মুসলিম রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ নিধন অভিযান। গতকাল দুপুরে আঞ্জুমানপাড়ায় কথা হয় অনুপ্রবেশ করা কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে। তারা বলেন, ‘আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে বার্মিজ সেনাবাহিনী। পাহাড়ে-জঙ্গলে অর্ধাহারে-অনাহারে কয়েক রাত কাটিয়েছি। ভেবেছিলাম অং সান সু চির বক্তব্যের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু ওই বক্তব্যের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নৃশংসতা আরও বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে কোনোমতে আমরা পালিয়ে এসেছি। ’ মংডুর বুড়া শিকদারপাড়া থেকে গতকাল আসা রাশিদা বিবি (৬৫) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার স্বামী মকবুল আহমেদকে তিন দিন আগে দুপুর বেলায় গুলি করে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী। বিবাহিত দুই মেয়ে আগেই চলে এসেছে। একসঙ্গে ১ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শিলখালী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। আমার সঙ্গে দুই মেয়ে ও এক ছেলে ছিল। আসার পর মেয়ে দুটিকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। ’ মিয়ানমারের পূর্ব তুমব্রু থেকে আসা নূর এরশাদ নামে এক কিশোর জানায়, তার মামা সৈয়দ আলম ও তাউই আলী হোসেনকে গুলি করে মেরে বস্তাবন্দী করে পুঁতে রাখা হয়। এটা সে আড়ালে থেকে দেখেছে। ওই নির্মম ঘটনার ভিডিওচিত্রও এই প্রতিবেদককে দেখায় নূর এরশাদ।উখিয়ার পালংখালীতে রাস্তার পাশে প্রখর রোদের মধ্যে শিশু কোলে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় বুসিদংয়ের মিংগিসি এলাকা থেকে আসা গৃহবধূ ফাতিমা খাতুনকে। গরমে কাবু হয়ে এক বছরের বাচ্চাটি ওই রোদেই মায়ের কোলে ঘুুমাচ্ছিল। ওই নারীর চোখ দিয়েও পানি ঝরছিল। কারণ, রবিবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর এখনো কোনো ঠিকানা মেলেনি তার। তাই কোনো ত্রাণও জোটেনি তার ভাগ্যে। বাচ্চাটিও ছিল অনাহারে। ফাতিমা খাতুন জানান, তার স্বামী হাসেম উল্লাহকে মেরে ফেলেছে সেনাবাহিনী। ঘরবাড়িও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই কোলের শিশু ও দুই ছেলেকে নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে এ পাড়ে চলে আসেন। মংডুর উকিলপাড়া থেকে বাংলাদেশে আসেন ২০ বছর বয়সী এক যুবক। তার ডান পায়ে গুলি লেগেছে। তাই টেকনাফ সড়কে হোয়াইক্যংয়ের এক পাহাড়ের কিনারায় বিষণ্ন চিত্তে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, ঘুমধুমের জলপাইতলী সীমান্ত দিয়ে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় সেনাবাহিনী তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ১৫ বছর বয়সী এক ছোট ভাই এনামুল হক গুলিতে মারা যায়। এদিকে নতুন করে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের দেখা গেল গাড়িতে করে তাদের সরকারের বরাদ্দ করা ক্যাম্পে পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে, সদ্য অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা স্থানীয় দালালদের খপ্পরে পড়ে টাকাপয়সা দিয়ে বিভিন্ন পাহাড়ে অস্থায়ীভাবে তাঁবু নির্মাণও করছে। যদিও বিভিন্ন পাহাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব রোহিঙ্গাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কুতুপালং ও বালুখালী সরকারি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিচ্ছে। দালাল চক্রের বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে গ্রেফতারও হয়েছেন বলে জানান হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মনির হোসেন। তিনি জানান, পাহাড়ে থাকার জায়গা দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার সময় কয়েকজন দালালকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। তাদের আটক করে থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া অং সান সু চির ভাষণকে ‘চরম মিথ্যাচার’ ও বোকা বানানোর ‘নতুন ষড়যন্ত্র’ বলে মনে করছে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা। তারা বলছেন, সু চির দেশে ফেরত যাওয়ার চেয়ে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করা অনেক ভালো। এ নিয়েও গতকাল আগত কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা হয়। সলিম উদ্দিন নামে এক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘যে দৃশ্য আমরা দেখে পালিয়ে এসেছি, এরপর আর সেখানে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এমনকি বাংলাদেশে মারা গেলেও না। সু চির বক্তব্যও আমরা শুনেছি। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এতে কেউ অন্যায় করে থাকলে তার বিচার করা হবে। কিন্তু সু চির বক্তব্যের পর নৃশংসতা আরও বহুগুণে বেড়েছে। সু চি বিশ্বকে বোকা বানানোর জন্য এমন মিথ্যাচার করেছেন। ’গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা কক্সবাজার হাসপাতালে : মিয়ানমারে গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গাদের সার্জিক্যাল অপারেশন চলছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। উচ্চ পর্যায়ের একটি চিকিৎসক দল গতকাল সকাল ১০টায় অপারেশন শুরু করে। আজও এ অপারেশন কার্যক্রম চলবে। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন আবদুর রহমান চৌধুরী জানান, এ হাসপাতালে বর্তমানে ৫৩ জন রোহিঙ্গা রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জনই গুলিবিদ্ধ। সদর হাসপাতালে একসঙ্গে এত রোগীর অপারেশন করার মতো চিকিৎসক ও সরঞ্জাম না থাকায় বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটি এগিয়ে এসেছে। ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. আবদুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসক দল অপারেশন শুরু করেছে। এ অপারেশন কার্যক্রম আজও চলবে।পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. আবদুল গনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মিয়ানমারে গুলিবিদ্ধ ও জখমি রোহিঙ্গাদের চিকিত্সার জন্য চিকিৎসক দলটি চিকিত্সাসেবা অব্যাহত রাখবে।[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার প্রতিনিধি আইয়ুবুল ইসলাম। ]