সেনাতে ফিরছে স্বাভাবিকতা

সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিনের মাথায় ত্রাণ বিতরণে ফিরে এসেছে শৃঙ্খলা। উখিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সড়কে কমেছে যানজট। রোহিঙ্গাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার জন্য তৈরি হচ্ছে ত্রাণকার্ড। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সবাইকে এ কার্ডের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। টেকনাফ ও উখিয়ায় অন্তত ১২টি ছাউনি বসিয়ে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরেজমিন বেশ কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, নারী-পুরুষ ও শিশুদের পৃথক সারিতে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে। একটি সারিতে ত্রাণ দেওয়া শেষ হলে আরেকটিতে শুরু হচ্ছে ত্রাণ বিতরণ। সেনাবাহিনীর এই সুশৃঙ্খল ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, বিজিবি ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। শরণার্থীরা প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়েও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। কারণ এই নিয়মে কেউই ত্রাণবঞ্চিত হবে না বলে মনে করছেন শরণার্থীরা। সরেজমিন টেকনাফের মুছনী ক্যাম্পের নয়াপাড়া অস্থায়ী সেনা ছাউনিতে গিয়ে দেখা গেছে, খোলা জমিতে দীর্ঘ সারি শরণার্থীদের। মধ্য দুপুরের কড়া রোদে কেউ কেউ ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন, কেউবা খোলা আকাশের নিচে। সেনা সদস্যদেরও একমুহূর্ত যেন বিরাম-বিশ্রাম নেই। প্রখর রোদে তারাও প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে। এ সময় কথা হয় এই ক্যাম্পের সমন্বয়ক মেজর করিমের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সকাল ৯টায় শুরু হয় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। প্রথম দফায় ৮৫০ জনকে, দ্বিতীয় দফায় ৩৫০ জনকে, তৃতীয় দফায় প্রায় এক হাজার জনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত দফায় দফায় ত্রাণ বিতরণ করা হবে। ’ঝামেলা কমাতে ত্রাণকার্ড প্রদানের মধ্য দিয়ে ত্রাণ বিতরণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর দু-এক দিন এভাবে গড়পড়তা ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এরপর প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারের জন্য একটি করে ত্রাণকার্ড দেওয়া হবে এবং পরিবারের কর্তাব্যক্তির নামে সেই কার্ড ইস্যু হবে। এ সময় মাত্র একজনই এসে তাদের পাঁচ থেকে সাত দিনের ত্রাণ একত্রে নিয়ে যাবে। ’ হ্নীলার উনছিপ্রাং ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, অন্তত দুই হাজারের অধিক শরণার্থীর বেশ কয়েকটি সারি। সেখানেও সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা মেজর আসাদ ও কক্সবাজার জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শামসুল আলমের সঙ্গে কথা হয়। শামসুল আলম বলেন, ‘এখানে আগে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ত্রাণ দেওয়া হতো। এখন সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে হলেও যৌথ সহযোগিতায় এখানে ত্রাণ বিতরণ চলছে। ’ মেজর আসাদ বলেন, ‘অনেক বড় এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন-পুরনো শরণার্থী যাচাই-বাছাই চলছে। আমাদের অন্তত শতাধিক সদস্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছেন। দু-এক দিনের মধ্যে ক্যালেন্ডার-সংবলিত একটি ত্রাণকার্ড দেওয়া হবে। যিনি যেদিন ত্রাণ নিয়ে যাবেন, সেদিন ক্যালেন্ডারের ওই তারিখে দাগ দেওয়া হবে। এতে আরও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সবারই ত্রাণপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। ’ এদিকে উখিয়া ডিগ্রি কলেজে স্থাপিত প্রধান পর্যবেক্ষণ সেলে গতকালও সেনাবাহিনী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার দেওয়া ত্রাণসামগ্রী জমা নেয়। দাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে একটি রসিদও প্রদান করা হয়। তবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় কোনো কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ক্যাম্পে গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। গতকাল থাইংখালীর হাকিমপাড়া, কুতুপালং ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ করেছেন আলম গ্রুপ অব কোম্পানিজের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরিফুল আলম, পরিচালক আবদুল কাইয়ুম, সাইমুম মিয়াসহ প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। একইভাবে এটিএন বাংলা, এসএ টিভিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও সেনা সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়। এদিকে গতকালও মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সীমান্তে আরও কাঁটাতারের পাশাপাশি স্থলমাইন বসিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। নো ম্যানস ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতেই মিয়ানমার এখনো এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানান দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যরা।