অন্তহীন সমস্যায় রোহিঙ্গারা

হাজারো সমস্যায় জর্জরিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। নিত্যনতুন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। মিয়ানমান সেনাবাহিনীর তাণ্ডব এখনো বন্ধ হয়নি। ফলে প্রতিদিনই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। বড় একটি অংশেরই এখনো ঠিকানা মেলেনি। খোলা আকাশের নিচে, গাছের তলায় কিংবা কারও শিবির ভাগাভাগি করে থাকতে হচ্ছে লাখো শরণার্থীকে। বৃষ্টি এলেই যেমন তাঁবুতে জমছে হাঁটুপানি আবার প্রচণ্ড খরতাপেও সেখানে থাকাই দায়।রোগবালাই তো আছেই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধদের বড় অংশই এখন রোগাক্রান্ত। গর্ভবতী প্রায় ৮০ হাজার নারীর স্বাস্থ্যসেবাও হুমকিতে। মেডিকেল ক্যাম্পগুলোর সামনে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। সেই সঙ্গে ত্রাণের যুদ্ধেও নামতে হচ্ছে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা শরণার্থীদের। নির্ঘুম রাতও এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। বাস্তুহারা এসব শরণার্থী নতুন এই পরিবেশে খাপ খাইয়েও চলতে পারছেন না। পোশাকে আশাকে কিংবা খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও তাল মেলাতে পারছেন না তারা। মানসিকভাবেও রোহিঙ্গারা এখন অনেকটাই ভারসাম্যহীন। গতকাল সরেজমিনে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী, পালংখালী, বান্দরবানের তুমব্রু, টেকনাফের লেদা ও মুছনীর বেশ কিছু ক্যাম্প ঘুরে নানা সমস্যার চিত্র দেখা যায়। প্রখর রোদের তাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকেই রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন। তিন দিনের বৃষ্টিতে হাঁটুপানি জমা তাঁবুগুলোর মেঝে কিছুটা শুকিয়ে আসায় অনেকেই সেখানে আবার ফিরে যাচ্ছেন। তবে বেশ কিছু তাঁবু ঘুরে দেখা যায়, তাঁবুর নিচে কাদাপানি জমে রয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দুই পাশে কিছু দূর পরপর হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণের অপেক্ষায় তাকিয়ে রয়েছেন। ত্রাণের গাড়ি দেখামাত্রই ছোটাছুটি করছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। আবার কোথাও কোথাও আশ্রয়শিবির তৈরিতে ব্যস্ত দেখা যায় অনেক রোহিঙ্গাকে। কুতুপালং ও বালুখালী সড়রেক দুই পাশে এর আগে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তারাও এখন নতুন ঠিকানার খোঁজে পালংখালী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ছেন। চাল-চুলাহীন এই শরণার্থীরাই এখন চরম বিপাকে। যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোরকম মাথা গোঁজার ঠিকানা খুঁজতে ব্যস্ত, তারা আবার সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। কোন দিক সামলাবেন, তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তে দেখা গেছে অনেক শরণার্থী পরিবারকে। এদিকে নিজ দেশে অনেক রোহিঙ্গা ছিলেন অবস্থাসম্পন্ন। কিন্তু মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিধনের জাঁতাকলে পড়ে মুহূর্তেই তারা হয়ে গেলেন পথের ফকির। তাই ত্রাণের জন্য ধাক্কাধাক্কি করা কিংবা কারও কাছে হাত পাতাও তাদের দিয়ে সম্ভব হচ্ছে না। এ ধরনের অনেক পরিবারকে রাস্তার ধারে বিষণ্নভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। আবার অনেক শিশু-কিশোরকেও দেখা যায় বোবা দৃষ্টি দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকতে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরোপুরি তারা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা। পালংখালীতে কথা হয় মিয়ানমারের বুসিদং থেকে আসা সৈয়দ উল্লাহর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘বালুখালী টিভি রিলে সেন্টার থেকে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাই পালংখালীর এই পাহাড়ে নতুন করে বসতি স্থাপন করতে হচ্ছে। একদিকে রোদ অন্যদিকে বৃষ্টি কোনোটাই এখন সহ্য করার মতো নয়। আবার এখানে কত দিন থাকতে পারব তাও নিশ্চিত নয়। স্ত্রীসহ সাত সদস্যের পরিবারের ভবিষ্যৎ কী তাও আমি জানি না। ’ থাইংখালীতে কথা হয় রাসিদং থেকে আসা মধ্যবয়সী নারী মাহমুদা বেগমের সঙ্গে। তার স্বামীকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গুলি করে মেরে ফেলেছে।প্রতিবেশীদের সঙ্গে ১২ দিন হেঁটে চার মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কুতুপাংলয়ের একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন। সেখানে দুই দিন থাকার পর তাদের বেরিয়ে আসতে হয়। এখন থাইংখালীতে কিছু টাকার বিনিময়ে একটি আশ্রয়শিবির করার জায়গা পেয়েছেন। এখানে কত দিন থাকতে হবে জানেন না। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. কাই কিসলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সরকার নির্ধারিত জায়গাতেই তাঁবু গাড়তে রোহিঙ্গাদের অনুরোধ করা হয়েছে। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্য কোনো পাহাড় বা বনভূমিতে তাঁবু নির্মাণ করলে তা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। কাউকে বিচ্ছিন্নভাবে থাকতে দেওয়া হবে না। তাই মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের সরকার নির্ধারিত জমিতে তাঁবু নির্মাণেন আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিজিবির তুমব্রু মেডিকেল ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা চিকিৎসা নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদেরই বেশি চোখে পড়ে। হালিমা খাতুন নামে এক গর্ভবতী নারীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছিলেন ডা. মেজর মাইনুল ইসলাম। হালিমার প্রেসারসহ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। তার সঙ্গে থাকা ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত দুই বছরের এক শিশুকেও বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, আল মারকাজুল ইসলাম বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি মেডিকেল ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গা রোগীদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে। মেডিকেল টিমের চিকিৎসকরা জানান, রোগীদের অধিকাংশই ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটব্যথা, নিউমোনিয়া, কাশিসহ ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। প্রতি ক্যাম্পেই ১৫ থেকে ২০ ভাগ গর্ভবতী নারীও আসছেন। তারাও নানা রোগে আক্রান্ত।মিয়ানমারে জ্বলছে আগুন, থামছে না রোহিঙ্গা স্রোত : মিয়ানমারের মংডু, রাসিদং, বুসিদং এলাকায় এখনো রোহিঙ্গা মুসলিম পাড়াগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে সে দেশের সেনাবাহিনী। আরাকানের এই তিন রাজ্যে এখনো আটকে আছে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশায় বসে আছে মংডুর শেষ প্রান্ত নাইক্যনদিয়ায়। আন্তর্জাতিক কোনো সাহায্য সংস্থাকেও সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ওইসব রোহিঙ্গা চরম খাদ্য সংকটে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আঞ্জুমানপাড়া, লম্বাবিল, টেকনাফের দক্ষিণপাড়াসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এখনো আসছেন রোহিঙ্গারা। সংখ্যায় কম হলেও প্রতিদিন নতুন নতুন শরণার্থী যুক্ত হচ্ছেন এপারের শিবিরগুলোয়।অব্যাহত রয়েছে ত্রাণ সহায়তা : বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনগুলো এখনো ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। গতকালও আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ত্রাণ সহায়তা দিতে দেখা গেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে গতকালও ত্রাণ বিতরণ করেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান। তার সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি হারুন অর রশীদ, কেন্দ্রীয় নেতা লুত্ফর রহমান কাজল, জেলা সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না, বিএনপির প্রেস উইং সদস্য শামসুদ্দিন দিদার, বিএনপি নেতা ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান, প্রকৌশলী মেসবাহউদ্দিন রাজু, ছাত্রনেতা শাহাদাত হোসেন প্রমুখ। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকেও দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে ত্রাণ দেওয়া হয়। আঞ্জুমানে হুদ্দামুল মোসলেমিনের পক্ষে ত্রাণ বিতরণ করেন অধ্যাপক নূর হোসেন, এস এম আবদুল করিম তারেকসহ অনেকেই।