দেরি হওয়ার আগেই সমাধান করুন

রোহিঙ্গা সমস্যা আরও প্রকট হওয়ার আগেই এর সমাধানে ওআইসির (ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা) সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এক হয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বিষয়ে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।পাশাপাশি তিনি এ সমস্যা সমাধানে ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে রোহিঙ্গা বিষয়ে ওআইসির কনটাক্ট গ্রুপ সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন ওআইসির মহাসচিব ইউসুফ আল ওথাইমেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ওআইসি যেসব উদ্যোগ নেবে, বাংলাদেশ তার সঙ্গে আছে। সংকটের মূলে মিয়ানমার। এর সমাধানও মিয়ানমারকেই খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এই জাতিগত নিধনের শেষ চাই। আমাদের মুসলিম ভাই ও বোনদের দুরবস্থাও বন্ধ করা দরকার। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রাখাইনে মুসলিম নিধন অভিযান শুরুর পর গত ২৫ আগস্ট থেকে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের ৬০ শতাংশই শিশু। এটা একটা অসহনীয় মানবিক বিপর্যয়। এ সময় শেখ হাসিনা ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত (ওআইসি) দেশের নেতাদের বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।রোহিঙ্গাদের রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর ছয় প্রস্তাব : প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের রক্ষায় সেখানে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ তৈরি ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ ছয়টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব করেন। ওআইসির কন্টাক্ট গ্রুপের সভায় তিনি এসব প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, ফোরামের যে কোনো উদ্যোগে যোগ দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের ঢল সামলাতে বাংলাদেশের জন্য ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোর কাছ থেকে ‘জরুরি মানবিক সহায়তা’র আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলো হল— রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সব ধরনের নির্মমতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদেরকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে অবশ্যই তাদের স্বদেশে ফেরত নিতে হবে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সুরক্ষা দিতে মিয়ানমারের ভিতরে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ তৈরি এবং ‘অনতিবিলম্বে নিঃশর্তভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে’ কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া মিয়ানমার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে, অবশ্যই তা বন্ধ করতে হবে এবং দেশটিকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে হবে।নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই : গতকাল জাতিসংঘে নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার জন্য টেকসই উন্নয়নের সফল বাস্তবায়নে নারীর ক্ষমতায়নে তাদেরকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সমান সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট রিকা লুুইস গুল্লারমো সলিস রিভেরা, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, আইএমএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টাইন লাগারদে ও ইউএন উইমেন-এর ফুমজিল ম্লামবো-গচুকা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসডিজি’র সফল বাস্তবায়নে নারীর ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই। সব ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে বিশ্ব সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন অর্জনে কার্যকরভাবে সফল হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারের নিম্ন থেকে উচ্চ সব স্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে। এসডিজি অর্জনে ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কর্মকাণ্ডে ২৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়া ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। ১০ শতাংশ শিল্প প্লট ও ১০ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তহবিল নারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের মাইক্রো ফিন্যান্স স্কিম, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজেস (এসএমই) দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখছে। কমপক্ষে ১০ শতাংশ ঋণ নারী পরিচালিত এসএমই’র জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকার নারী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে জয়িতা নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ফাউন্ডেশন থেকে তৃণমূল পর্যায়ে ১৮ হাজার নারী উদ্যোক্তা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৪০ লাখেরও বেশি নারী পোশাক শিল্পে কাজ করছে। ৩৫ শতাংশ নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। জিডিপিতে নারীর অবদান হচ্ছে ৩৪ শতাংশ। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে প্রত্যেক খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।এর আগে প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে যোগদানকারী রাষ্ট্র প্রধানদের সম্মানে জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত আনুষ্ঠানিক মধ্যহ্ন ভোজে যোগ দেন।শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যৌন নির্যাতন বন্ধে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের মধ্যে যৌন অপরাধ নির্মূলে জাতিসংঘের মহাসচিবের পদক্ষেপের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সংক্রান্ত ভিকটিম সাপোর্ট ফান্ডে এক লাখ ডলার প্রতীকী চাঁদার ঘোষণা দেন তিনি। গত সোমবার জাতিসংঘ সদর দফতরে ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে যৌন নির্যাতন ও অপরাধ দমন শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা সদস্য ও পুলিশ সদস্য নিয়োগকারী হিসেবে আমরা যৌন নির্যাতন ও অপরাধ বন্ধের বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করি। এ অভিযোগের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান হচ্ছে জিরো টলারেন্স। তিনি বলেন, শান্তিরক্ষী বাহিনীতে নিয়োগের আগে প্রশিক্ষণে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকে একটি অবিচ্ছেদ্য বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যৌন অপরাধের অভিযোগে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কন্টিনজেন্ট কমান্ডারদের দেওয়া হয়েছে। তারা মিশন এলাকায় যে কোনো অভিযোগের তদন্ত ও বিচার করতে পারবে।অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তৃতা দেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি মিরসলভ লাজকাকও বক্তৃতা করেন।