ত্রাণের জন্য হাহাকার

টেকনাফ থেকে উখিয়ার বালুখালি, কুতুপালংয়ের পথে ২০ কিলোমিটার সড়কে এখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় আর সাহায্যের জন্য ছুটছে।বিচ্ছিন্নভাবে স্থানীয়দের দেওয়া খাবার আর কাপড় ছাড়া এই শরণার্থীদের জন্য সংগঠিতভাবে তেমন কোনো ত্রাণ তৎপরতাও এখনও শুরু করা যায়নি।     মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর গত তিন সপ্তাহে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উখিয়ার কুতুপালং থেকে শুরু করে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাহাড়ে পাহাড়ে অসংখ্য ঝুপড়ি গড়ে তুলেছে তারা।আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলছে, নতুন করে আসা এই রোহিঙ্গাদের অর্ধেকের বেশি কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশে, পাহাড়ে এবং জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এ পর্যন্ত যেসব ত্রাণের ট্রাক এসেছে, সেগুলো ওই সড়ক দিয়েই এসেছে বলে তারা রাস্তার কাছাকাছি থাকতে চাইছে।আর যারা বাঁশ আর পলিথিনের ঝুপড়ি তুলে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে পেরেছে, তাদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম।বালুখালি বাজারের পাশে গড়ে ওঠা নতুন বস্তিতে আশ্রয় পাওয়া চল্লিশোর্ধ নারী সোনেভান জানান, পুরুষ আর শিশুরা সবাই রাস্তার পাশে বসে আছে, যদি কোনো ট্রাক থেকে কিছু পাওয়া যায় এই আশায়।    গত ২ সেপ্টেম্বর সীমান্ত পেরিয়ে আসার পর কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশে ঝুপড়ি তুলে তাতে স্ত্রী আর চার সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এরশাদ উল্লাহ নামের এক রোহিঙ্গা।বুধবার দুপুরে রাস্তার ওপর এক ট্রাক থেকে ছুড়ে দেওয়া খাবার পাওয়ার লড়াই শেষে ঝুপড়ির কাছে ফিরে তিনি বললেন, এই জায়গা ছেড়ে গেলে আর কিছুই জুটবে না। এই ভয়ে তিনি অন্য কোথাও যাচ্ছেন না।বালুখালি ক্যাম্পের কাদায় ভরা পথ দিয়ে একটি পলিব্যাগ হাতে হেঁটে আসা ৪০ বছর বয়সী ওসমান জানালেন, ভিড়ের মধ্যে ট্রাক থেকে ছুড়ে দেওয়া ত্রাণ ধরতে না পরালেও গাড়ি নিয়ে আসা এক লোকের দেওয়া নগদ কিছু টাকা পেয়েছেন তিনি। তাই দিয়ে বাজারের এক দোকান থেকে আধা কেজি চাল আর কিছু আলু কিনে এনেছেন।মিয়ানমারে ভিটেমাটি ছেড়ে আসা এই শরণার্থীদের থাকা, খাওয়া বা চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত যে ব্যবস্থা হয়েছে তা একেবারেই অপর্যাপ্ত।  রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের চেষ্টায় যেসব মেডিকেল ক্যাম্প হয়েছে, সেখানে তারা জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া আর ছোটখাটো কাটাছেড়ার চিকিৎসা পাচ্ছেন।শরণার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপেয় পানির অভাব। বালুখালি শরণার্থী ক্যাম্পের বাইরে সড়কের পাশে ১২০০ লিটার ধারণ ক্ষমতার তিনটি প্লাস্টিকের ট্যাংক দেখা গেছে, যেগুলোতে লেখা রয়েছে ‘নিরাপদ খাবার পানি’।  তা দিয়েই কয়েক হাজার মানুষের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।    আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিষয়ক সংস্থার (আইওএম) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মুখপাত্র ক্রিস লম এখন কাজ করছেন কক্সবাজারে।বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখনও পুরোমাত্রায় ত্রাণ তৎপরতা শুরু করতে পারেনি। তাছাড়া শরণার্থীরা বড় এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় তাদের কাছে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  “আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে খুব বেশি সহায়তা এখনও পৌঁছায়নি। স্থানীয় কিছু সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে ত্রাণ দিচ্ছে। মূলত ট্রাকের পেছন থেকে রাস্তার ওপর শরণার্থীদের মধ্যে খাবারের প্যাকেট ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। কাপড় আর নগদ টাকাও কেউ কেউ দিচ্ছে।”   জাতিসংঘ গত সপ্তাহেই রোহিঙ্গাদের জন্য সাত কোটি ৭০ লাখ ডলারের সহায়তার আবেদন জানিয়ে রেখেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে তা যথেষ্ট হবে বলে ত্রাণকর্মীরা মনে করছেন না।  ক্রিস লম বলেন, এত বিপুল সংখ্যক মানুষ এত অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়বে, তা কেউ ধারণা করতে পারেনি।পর্যাপ্ত সহায়তা যদি পাওয়াও যায়, শরণার্থীদের জন্য অবকাঠামো ও ত্রাণ বিতরণের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে সাহায্যের ওই অর্থ ব্যয় করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন এই আইওএম কর্মকর্তা।  তিনি বলেন, নতুন করে যারাই আসছে তাদের নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে রাখা এবং তদাদের ত্রাণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য নিবন্ধন ও পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি।সরকার রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়ায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ত্রাণ আসতে শুরু করায় শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।কুতুপালং ও বালুখালির দুটি পুরনো শরণার্থী ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে ১৭টি বুথ খুলে গত কয়েকদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রম চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। ত্রাণ তৎপরতা সমন্বয়ের জন্য উখিয়া উপজেলা প্রশাসন একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও খুলেছে।   চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট  আবদুস সামাদ শিকদারকে ওই নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তদারকির জন্য উখিয়ায় পাঠানো হয়েছে।তিনি জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার পর সেখান থেকে সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ তৎপরতা চালানো হয়নি। তবে বাইরের যারা ত্রাণ দিতে চাইছেন তাদের সমন্বয়ের কাজটি এখান থেকে করার চেষ্টা হচ্ছে।“সবাইকে বলা হচ্ছে যেন তারা রাস্তায় ত্রাণ না দিয়ে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে তা দেন। অবশ্য তাতে খুব বেশি সাড়া এখনও পাওয়া যাচ্ছে না।” রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ত্রাণের দুটি চালান ইতোমধ্যে দুবাই থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে। সেখানে ২৫ হাজার মানুষের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর মত তাঁবু, কম্বলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র রয়েছে। আরও ১ লাখ ২০ হাজার শরণার্থীর জন্য ত্রাণ বহনের ফ্লাইট তৈরি হচ্ছে বলে ইউএনএইচসিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য ইউনিসেফের পাঠানো জরুরি সামগ্রীর চালান কক্সবাজারের পথে রয়েছে।ভারত সরকারের পাঠানো ৫৩ মেট্রিক টন চাল, ডাল, বিস্কুট, লবণ, চিনি, সাবান, মশারি ও গুঁড়ো দুধের প্রথম চালানটি বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে খালাস করা হয়েছে।এছাড়া মরক্কোর পাঠানো ১৪ টন ত্রাণ সামগ্রীও ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে।