ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা রোহিঙ্গাদের পাশে থাকব

গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে আশ্রয়ের খোঁজে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের সঙ্গে কথা বলে দিয়েছেন পাশে থাকার সান্ত¡না। কল্পনাতীত অসহায়ত্বের সময়ে আশ্রয় নেয়া দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে সব হারানো রোহিঙ্গারাও আপ্লুত। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে এদিন চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি বঙ্গবন্ধু কন্যা। এই দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া শেখ হাসিনা আশ্রয় নেয়া প্রত্যেকের কাছে তার সান্ত¡নার বাণী পৌঁছে দেন। একমাত্র বোন এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। অশ্রুসজল প্রধানমন্ত্রী প্রায় আধা ঘণ্টা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্দশার কথা শুনেন।গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণ করতে যান প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ১২টায় রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে এক সভায় তিনি রাখাইনের জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগণের ওপর অমানবিক আচরণ এবং অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ করে প্রতিবেশী মিয়ানমারের প্রতি শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে বাংলাদেশ। সকাল সাড়ে ১০টায় রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। আন্তর্জাতিক সংস্থাদের বলবো, তারা যেন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি চাপ প্রয়োগ করে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমরা শান্তি চাই, তবে কোনো অন্যায় আমারা মেনে নিতে পারি না। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ না দিয়ে, ত্রাণ যেন স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দেয়া হয়- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।মিয়ানমারে যা ঘটছে, তাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, এ ঘটনা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। মানুষের কেন এত কষ্ট কীভাবে তাদের ওপর অত্যাচার হয়েছে এই অবস্থা সত্যি সহ্য করা যায় না। কেন এই অত্যাচার? তারা তো তাদের নিজেদের দেশেরই লোক।রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এরা মিয়ানমারের নাগরিক, এদের ফিরিয়ে নিতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে। নিজেদের নাগরিক অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা অসম্মানজনক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলবো রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে। মানবিক কারণে আশ্রয় নেয়া এসব রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন এদেশের ক্ষতি না করতে পারে সেই বিষয়কে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্য থেকে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে অমরা যুদ্ধ চাই না। শান্তিপূর্ণভাবে সঙ্কট সমাধান করতে হবে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমরা শান্তিপুর্ণ অবস্থান চাই। কিন্তু মিয়ানমারের কোনো অন্যায় আচরণ বরদাশ্ত করা হবে না।প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে, মানুষ খুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল। এখন পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের (রাখাইন) আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। নির্বিচারে খুন, গুম ও নির্যাতন করা হচ্ছে। গোটা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আজ বিপর্যস্ত। গুলি করে, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মেরে মিয়ানমার সরকার মানবতাবিরোধী কাজ করছে। সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে।গুলিবিদ্ধ, আহত, নির্যাতিত এবং স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের দেখে শেখ হাসিনা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা আর কেউ না বুঝলেও; আমি বুঝি। আমি আপনাদের পাশে আছি। আপনাদের পরিচয়পত্র প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থান সহজ করা হবে। আপনাদের বাসস্থান, খাদ্য ও নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে।মিয়ানমারের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে, নাগরিক অধিকার না দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি খাদ্য, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সুষ্ঠু ত্রাণ বিতরণ ও রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে কোনো গোষ্ঠী যেন নিজেদের ভাগ্য গড়ার সুযোগ না পায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী উখিয়া-টেকনাফ তথা কক্সবাজারের জনগণকেও ধন্যবাদ জানান।সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে বিশেষ ফ্লাইটে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখান থেকে সড়ক পথে মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে সাড়ে এগারটায় উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান তিনি। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে কক্সবাজার থেকে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পর্যন্ত সর্বত্র ছিল নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে তৈরি করা হয় বক্তৃতা মঞ্চ। প্রধানমন্ত্রী ক্যাম্পে পৌঁছলে কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চেীধুরী মায়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন খান কামালসহ আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।সেখানে পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী ক্যাম্পে স্থাপিত হাসপাতালে আহত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের দেখতে যান। এসময় প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা জানান। বক্তব্য শেষ করে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হাতে ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেন। এ ছাড়া কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।ত্রাণ বিতরণের সময় শরণার্থীদের মুখ থেকে দুর্দশার কথা শুনে চোখ ভিজে ওঠে প্রধানমন্ত্রীর। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানাও এ সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই সফরে ছিলেন, তার ছোট বোন শেখ রেহানা। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ শেষে দুপুর একটার দিকে কক্সবাজার রওনা হয়ে সার্কিট হাউজে অবস্থান করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নামাজ ও মধ্যাহ্ন বিরতি শেষে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বেলা ৩টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা।এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমণের পর রোহিঙ্গাদের মাঝে নতুনভাবে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা সরকার প্রধানের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছেন। মিয়ানমার সরকারকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমধান করে নিজ দেশে রোহিঙ্গারা ফিরে যাবেন এমনটিই আশা অধিকাংশ রোহিঙ্গার।