রোহিঙ্গা নির্যাতনের বর্ণনা শুনে কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নারকীয় তাণ্ডবের বর্ণনা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্যাতিত নারী ও শিশুর মুখে নির্বিচারে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের কথা শুনে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে দুর্দশাগ্রস্তদের দেখতে গিয়ে প্রথমে নিপীড়িত এক শিশুর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। মিয়ানমারের বলিবাজার এলাকার শিশু রেদোয়ান তার পরিবারের ওপর নিজ দেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। সে বলে, তাদের জোর করে বাড়ি থেকে বের করার পর আগুন দেয়া হয়। তার বাবাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশুটিও। আঘাত করে তার নাক থেঁতলে দেয়া হয়েছে। নিপীড়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে শিশুটি। এ সময় প্রধানমন্ত্রীও উদ্বাস্তু শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠে সান্ত্বনা দেন রেদোয়ানকে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার ছোট বোন শেখ রেহানাও ছিলেন। শেখ রেহানাও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। শেখ রেহেনার পুত্রবধূ আইওএম কর্মকর্তা পেপ্পি সিদ্দিকও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।এরপর ঢেকিবনিয়া উত্তরপাড়ায় মিয়ানমান সেনাদের আক্রমণে আহত সাইফুল্লাহসহ নির্যাতিত নারী ও শিশুদের কথা শুনে তাদের সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ১৯০৯ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছান। সেখান থেকে সড়কপথে উখিয়া যান প্রধানমন্ত্রী। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে কুতুপালংয়ে পৌঁছে তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা দুর্ভাগা নারী, পুরুষ, শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন ও ত্রাণ বিতরণ করেন।স্বামী-সন্তানহারা কয়েক নারী প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে স্বজন হারানোর বেদনায় কেঁদে উঠেন। তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আপনি মায়ের আঁচলে আশ্রয় দেয়ার মতো কাজ করেছেন। এখানে ঢুকতে না পারলে এতদিন বেঁচে থাকতাম কিনা জানি না। এ বলে নারীটি প্রধানমন্ত্রীকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে উদ্যত হন। প্রধানমন্ত্রী তাকে বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দেন।রাখাইন রাজ্যের রাসিদং এলাকায় স্বামীকে হারিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে আসা রেজিয়া বেগম (৩৭) বলেন, নিজ দেশের সরকারপ্রধান পেটুয়া বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করাচ্ছে। দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। কিন্তু আশ্রয় দেয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের দুর্দশা দেখতে এসে ব্যথিত হয়ে কাঁদলেন। দুটি দু’ধরনের পাওয়া। আল্লাহ যেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দীর্ঘায়ু দেন, তার জন্য ফরিয়াদ জানান তিনি।পরে সংক্ষিপ্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে যা ঘটছে, সেটি ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’। এ নির্যাতনের চিহ্ন দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে তিনি মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা প্রকৃত দোষী তাদের খুঁজে বের করুন। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্য করা দরকার, আমরা করব।মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেও এ দেশের ভূমি ব্যবহার করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো হলে তা বরদাশত করা হবে না বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন শেখ হাসিনা।ভাষণ ও ত্রাণ বিতরণ শেষে ফিরে আসার সময় একপাশে জড়ো হয়ে থাকা নারীদের দিকে এগিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তাকে কাছে পেয়ে নারীদের মাঝে কান্নার রোল উঠে। এতে প্রধানমন্ত্রী ও তার সাঙ্গে যারা ছিলেন তাদের চোখও ঝাপসা হয়ে উঠে। তিনি নির্যাতিত ও স্বজনহারা নারীদের সান্ত্বনা দিয়ে ফিরে আসনে।