অর্থসঙ্কটে ঝোঁক বাড়ছে বিদেশী ঋণে

image_titleব্যাংকগুলোতে আবারো টাকার তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সঙ্কট মেটাতে তারা উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। আর এতে বেড়ে গেছে ঋণের সুদহার। উচ্চ সুদের হাত থেকে বাঁচতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা আবার ঝুঁকে পড়েছেন বিদেশী ঋণের দিকে।

লাইবরের (লন্ডন ইন্টার ব্যাংক রেট) সাথে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ দিলেই মিলছে বিদেশী ঋণ। ফলে বিদেশী ঋণের সুদ পড়ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিদেশী ঋণের সুদ আপাতদৃষ্টিতে সস্তা মনে হলেও ডলার টাকার বিনিময় হারের হিসাব করলে কার্যকর সুদহার অনেক বেড়ে যাবে। সেই সাথে দেশের ওপর বাড়বে সুদসহ বিদেশী ঋণের দায়।বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি মিলে বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশী ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসেবে) মতো। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন বা প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকাই স্বল্পমেয়াদি (এক বছরের কম মেয়াদে) ঋণ। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বেসরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যাওয়ায় দায় বাড়ছে দেশের ওপর। কারণ, এসব ঋণ হলো সরবরাহ ঋণ, যা হার্ড লোন হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ এ ঋণের সুদ নির্ধারণ হয় বাজার রেটে। এ কারণে এসব ঋণের সুদ তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার এসব ঋণ নেয়া হয় বিদেশী মুদ্রায়, কাজে লাগানো হয় স্থানীয় মুদ্রায় আবার পরিশোধও করা হয় বিদেশী মুদ্রায়। সুতরাং এসব ঋণ বেশি হলে দেশের ওপর চাপ বাড়ে। এ কারণে এসব ঋণ সীমার মধ্যে রাখাটাই দেশের জন্য ভালো।কেন বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, যখন ব্যবসায়ীদের বিদেশী ঋণ আনার অনুমোদন দেয়া হয় তখন দেশীয় ব্যাংকগুলোর তারল্যসঙ্কট চলছিল। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের ঋণ দেয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে ছিল না। টাকার সঙ্কটের কারণে ঋণের সুদ হারেও আকাশমুখী হয়।

তখন ব্যাংকগুলোও উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে। তখন আমাদের সর্বোচ্চ সুদের হার ছিল ১৪ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত নিতে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা ব্যয় করেছে। এ সময়কাল ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরের দিকে। উচ্চ সুদে আমানত নিয়ে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হারে ঋণ দিতে থাকে ব্যাংকগুলো। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি।ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক ঋণ আনার অনুমোদন দেয়। বলা চলে তখন থেকে বেসরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক ঋণ আসতে থাকে। সর্বোচ্চ ৫ বছর মেয়াদি এসব ঋণ আনতে ব্যবসায়ীরা ক্ষেত্রবিশেষ সাড়ে ৪ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে। এর পর অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা তাদের তহবিল সঙ্কট মেটায়। সর্বোচ্চ ১ বছরের কম মেয়াদি এসব ঋণ আনতেও ক্ষেত্রবিশেষ সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ শতাংশ সুদ দিয়ে আসছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংকেরই চরম অর্থসঙ্কট চলছে। এ অবস্থায় টাকার সঙ্কট মেটাতে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ শুরু করেছে। গড়ে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকই এখন ডাবল ডিজিটে আমানত সংগ্রহ করছে। কোনো কোনো ব্যাংক ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নিচ্ছে। উচ্চ সুদে আমানত নেয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ঋণের সুদহার বেড়ে গেছে। এমনি পরিস্থিতিতে কিছু কিছু উদ্যোক্তা আবারও বিদেশী ঋণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ শুরু করেছে। তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব ঋণের সুদ আপাতত কম মনে হলেও কার্যকরী সুদহার আরো বেড়ে যাবে। যেমন একজন বিনিয়োগকারী বিদেশ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে ১০০ কোটি ডলার (৮৪ টাকা প্রতি ডলার হিসেবে) ঋণ গ্রহণ করল। এক বছর পর প্রতি ডলার ৯০ টাকা হলে প্রতি ডলারে টাকার মান কমে প্রায় ৭ শতাংশ। ডলারে ঋণ করে টাকায় ব্যয় করলেও ডলারে পরিশোধ করায় বিনিময় হারের কারণে সুদ ব্যয় বেড়ে হবে (৬.৫+৭) সাড়ে ১৩ শতাংশ। এভাবে কেউ ৫ বা ১০ বছর মেয়াদি বিদেশী ঋণ নিলে কার্যকরী হার অনেক বেড়ে যাবে। যেমন, ২০১৬ সালে প্রতি ডলার ছিল ৭৯ টাকা, বর্তমানে যা আমদানি পর্যায়ে ৮৫ টাকায় উঠে গেছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত ২০১১ সালে ৯২ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে ১৪৯ কোটি টাকার ঋণ নেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়। এর পর প্রতিবছরই তা বাড়তে থাকে। এর সাথে যোগ হয় অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক ঋণ। অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক ঋণের জোগান দিয়ে আসছে। অর্থাৎ ব্যাংক বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিয়ে ওই ঋণ আবার ব্যবসায়ীদের মাঝে বিতরণ করছে। ফলে বেসরকারি পর্যায়ে প্রকল্প ঋণ ও অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত অলস টাকা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে এ থেকে যে সুদ পরিশোধ করত তা দেশেই থেকে যেতো। এতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর কোনো চাপ বাড়ত না। এতে ব্যাংকগুলোরও তহবিল ব্যয় কমতো যা সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ত। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীরা বিদেশী ঋণ নেয়ায় বৈদেশিক মুদ্রায় সুদ পরিশোধ করছেন। এতে এসব ঋণের সুদ বৈদেশিক মুদ্রায় চলে যাচ্ছে বিদেশে। এ ব্যয় বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর পড়বে। ইতোমধ্যে রফতানি আয় কমে যাওয়ায় ও আমদানি ব্যয় তুলনামূলক বেশি বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমতে শুরু করেছে। বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ বাড়তে থাকলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরো বেড়ে যাবে, যা অর্থনীতির জন্য মোটেও কল্যাণকর হবে না বলে তারা মনে করছেন।।