ইতালির পালেরমো শহরে মুসলিমদের ইতিহাস ঐতিহ্য

image_titleআন্তর্জাতিক ডেস্কআরটিএনএনরোম: দুই ডজন শিশুর পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধুর ধনিতে ইতালির সিসিলি দ্বীপের রাজধানী পালেরমো শহরের ‘Islamic Cultural Center of Via Roma’ পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে।পালেরমোর ইসলামিক কেন্দ্রটিতে শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ যেখানে তারা নিজেদের খেয়াল খুশি মত খেলাধুলায় অংশ নিতে পারে।  ইসলামিক কেন্দ্রটির ইমাম সাহাব উদ্দিন শিশুদের তদারকি করে থাকেন এবং তাদের কে নিয়ম শৃঙ্খলা শিক্ষা দেন।২৫,০০০ অভিবাসীর বাসস্থান পালেরমো শহরটি বহু সংস্কৃতির একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে যা সেখানে এমন ভাবে ভিত্তি গেঁড়ে বসেছে যা সিসিলির ইতিহাসের ভিত রচনা করেছে।

এখানকার অভিবাসীদের অধিকাংশ এসেছে বাংলাদেশের মত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল সমূহ থেকে।নবম এবং এগর শতকের মধ্যে ২০০ শত বছর যাবত ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত সিসিলির রাজধানী পালেরমোর সাথে মুসলিমদের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। পালেরমো শহরটি এখনো ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে এবং সংস্কৃতি গত দিক থেকে ইসলামের ইতিহাস বহন করে চলেছে।পালেরমো শহরের ইমাম আহমাদ আবদ আল মাজিদ ইসলামিক কেন্দ্রের দেয়াল ধরে হেঁটে যান এবং ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন এর মিহরাব টি এমন ভাবে তৈরী যা ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কার দিকে মুখ করে রয়েছে।তিনি বলেন, ‘এখানকার প্রত্যেক চার্চ একটি মসজিদ হিসেবে কখনো কখনো সিনাগগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটিই সিসিলির ইতিহাস।’ইমাম আহমাদ মনে করেন পালেরমোর ক্যাথের্ডালের দেয়ালে পবিত্র কুরআনের অনেক বাণী খোদাই করা রয়েছে যেখানে আরব স্থাপত্যবিদ গণের অবদান রয়েছে এবং এখানকার সংস্কৃতির এমন উদারতার ফলে মুসলিম অভিবাসীরা পালেরমো কে তাদের নিজস্ব ঘর বলে বিবেচনা করে থাকেন।তিনি বলেন, ‘নিশ্চিত ভাবে বিশ্বের যে সকল স্থান থেকে মুসলিমরা এখানে এসে থাকেন তাদের জন্য সিসিলি এমন একটি স্থান যেখানে তার প্রকৃতিগত ভাবে ঐক্য এবং মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বোধ খুঁজে পান।’‘সিসিলিয়ানরা ইউরোপের অন্য স্থান সমূহের বৈচিত্র্য থেকে ভিন্ন। সিসিলিয়ানদের ডিএনএ তে ইসলামিক বিশ্বের জন্য তীব্র অনুরাগ রয়েছে।’২৯ বছর বয়সী মাসরুর রাহিম যিনি তার পরিবারের সাথে নয় বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে পালেরমো তে স্থায়ী ভাবে চলে আসেন।তিনি বর্তমানে একটি ট্রাভেল এজেন্সি তে কাজ করেন। সিসিলিয়ানদের ইসলামিক পূর্ব পুরুষদের সম্পর্কে গর্ববোধ করা দেখে তিনি অবিভূত।তিনি বলেন, ‘আপনি এখানকার মানুষদের মধ্যে একধরনের যোগসূত্র অনুভব করবেন কারণ মুসলিমরা এখানকার লোকজনদের ভেতর এমন কিছু রেখে গিয়েছিল যা এখনো তারা ভুলতে পারে নি।’তিনি বলেন, ‘তারা ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের লোকজনদের চাইতে একেবারে ভিন্ন। তারা অধিক আন্তরিক এবং ইতালির যে কোনো স্থানের চাইতে অধিক হারে অভিবাসীদের গ্রহণ করে নেয়।

’ইমাম সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘ইতালি একটি ভবনের ভিন্ন ভিন্ন কামরার মত। ইতালির উত্তরাঞ্চলের লোকজন একেবারে উপরের কামরায় রয়েছে তারা নিচের কামরার লোকজনদের সাথে কথা বার্তা বলে না। উত্তরের কিছু শহর যেমন পাদোভা এবং ভেনিস আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। যদি আমি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করি এবং তাদের কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই তখন তারা আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। কিন্তু দক্ষিণের এই শহরে যদি আমি কারো নিকট কিছু জানতে চাই তখন তারা তাৎক্ষণিক এর উত্তর দিয়ে থাকে।’‘Medieval Studies in Palermo’ এর আরবি ভাষার অধ্যাপক এবং পরিচালক পাট্রিজিয়া স্পালিনো ব্যাখ্যা করে বলেন যে, এই দ্বীপে তিউনিসিয়ান আরবি ভাষা বিগত ১০০০ হাজার বছর পূর্ব হতে প্রচলিত রয়েছে যা এখনো সিসিলিয়ানদের প্রতিদিনের উচ্চারণে লক্ষ্য করা যায়।পালেরমো শহরের নিকটবর্তী অঞ্চল মার্শাল শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ মার্সা আল্লাহ থেকে যার অর্থ ‘সৃষ্টি কর্তার বন্দর।’একই ভাবে সিসিলিয়ানদের ব্যবহৃত অনেক শব্দে আরবি ভাষার ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায়, যেমন তারা মেসকিন শব্দটি ব্যাবহার করে যা এসেছে আরবি মিসকিন শব্দ থেকে যার অর্থ গরিব লোক।তিনি বলেন, ‘আপনি যখন কোনো আরব দেশে সফর করবেন এবং যদি তারা আপনাকে তাদের ঘরে আমন্ত্রণ জানায় তবে আপনি দেখবেন তারা আপনাকে প্রথমেই চা পান করতে দিবে এবং কিছু খেতে দিবে আর এই বিষয়টি সিসিলিয়ানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ইতালির সব স্থানে অথিতিয়তা একরকমের নয়।বিগত কয়েক বছর যাবত ইতালিতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু হামলা চালানো হয়। গত বছর ইতালির মাচের্তা শহরে স্থানীয় একজন লোক ছয় জন আফ্রিকান অভিবাসীর উপর বন্দুক দিয়ে হামলা চালায়।এসবের পাশা পাশি ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি একই সাথে ইতালির বন্দর সমূহ থেকে উদ্ধার কৃত অভিবাসীদের গ্রহণ করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।আর ইতালির অভিবাসীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা নীতি সমূহের সবচেয়ে বেশী সমালোচনা করেন পালেরমোর মেয়র লিওলুকা ওর্লান্ডো।তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালভিনির সমালোচনা করে বলেন, ‘সালভিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নয় বরং তিনি ইতালির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সে আমাদের অথিতিয়তার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। সে আমাদের ইতিহাসের বিরুদ্ধে।’অভিবাসীদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার স্বীকৃতি সরূপ ওর্লান্ডোর দপ্তর কে আগা খান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে একটি কফি টেবিল আয়তনের ২০০ শত বছর পুরনো পবিত্র কুরআনের একটি কপি উপহার দেয়া হয়।ওর্লান্ডো বলেন, ‘ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের কথা উঠলে আমাকে বলতে হবে আমরা ইউরোপিয়ান নই, এমন কথা বলার জন্য আমি দুঃখিত কিন্তু পালেরমো ফ্রাঙ্কফুর্ট বা বার্লিন নয়।’তিনি বলেন, ‘পালেরমো প্যারিস নয়, পালেরমো হচ্ছে বৈরুত শহর, পালেরমো ইস্তাম্বুল, পালেরমো জেরুজালেম, পালেরমো তাইপে। পালেরমো হচ্ছে ইউরোপে অবস্থিত মধ্য প্রাচ্যের একটি শহর। ভূমধ্য সাগর একটি সাগর নয় বরং একটি একটি মহাদেশ। আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে ভূমধ্য সাগরের পরিচয় বহন করি।’বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হিসেবে আসা মাসরুর এর মত এই বহু সংস্কৃতির পরিচয় তাকে এখানকার স্থানীয়দের মধ্যে সহ্য করে নেয়া হয় নি বরং তাকে গ্রহণ করে নেয়া হয়েছে।’তিনি বলেন, ‘আমি এখন পালেরমো কে আমার ঘর বলে অনুভব করি। আমি যদি ইতালির ভেনিস বা মিলানে গিয়ে থাকি আমি তখন এসব শহর কে আমার ঘর বলতে নারাজ। আমি তখন আমার ঘর পালেরমো তে ফিরে যেতে চাইবো।’সূত্র: আলজাজিরা ডট কম।।