নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ

শত ভোগান্তি সত্ত্বেও স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে ছুটছে মানুষ। যানবাহনের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা, দুর্ভোগ আর ক্লান্তিতেও ম্লান হচ্ছে না তাদের মুখমণ্ডলের আনন্দের ছাপ। এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি।কখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কখনও অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে অবিরাম পথ চলা। রাজধানীর কমলাপুরের রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার জনস্রোত নেমেছিল।ট্রেনে ইঞ্জিনের কভার, ছাদে চড়ে যান মানুষ। ছাদে জায়গা না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে গেছেন মানুষ। একই অবস্থা লঞ্চেও। বেসরকারি হিসাবে ঈদ উপলক্ষে প্রায় ১ কোটি মানুষ ঢাকার বাইরে যাবে। আর এ সুযোগ হাতছাড়া করেনি পরিবহন খাতের অসাধু চক্র। আসন ক্ষমতার দ্বিগুণ/তিনগুণ যাত্রী নেয়া, বাড়তি ভাড়া আদায়, বিলম্বে যানবাহন ছাড়াসহ যাত্রীদের নানা কায়দায় হয়রানি করেছেন তারা।যাত্রীর ভিড়ে ট্রেন দেখা যায় না : বৃহস্পতিবার ছিল অগ্রিম টিকেট কাটা যাত্রীদের ৫ম দিনের ভ্রমণ। এদিন ভোর থেকেই কমলাপুর, তেজগাঁও ও বিমানবন্দর স্টেশনে, শত শত যাত্রী ছিলেন অপেক্ষায়। এক একটা ট্রেন আসতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন যাত্রীরা। এতে টিকিটধারীদের উঠতে ভোগান্তিতে পোহাতে হয়েছে।কমলাপুর থেকে প্রায় ৫ ঘণ্টা পরে লালমনিরহাটে ছেড়ে গেছে লালমনি এক্সপ্রেস। চিলাহাটির নীলসাগর এক্সপ্রেস ছেড়েছে সাড়ে ৩ ঘণ্টা দেরিতে। এছাড়াও রংপুর এক্সপ্রেস ছেড়েছে ২ ঘণ্টা, রাজশাহীর উদ্দেশে ধূমকেতু ১ ঘণ্টা ও খুলনার উদ্দেশে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছেড়েছে এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট দেরিতে। ভোর থেকেই কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনে ছিল ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও সিলেটগামী ট্রেনগুলোতে ছিল না তিল ধারণের ঠাঁই। সিডিউল বিপযর্য়ের কারণে প্ল্যাটফর্ম ভরে যায় যাত্রীতে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, যে ট্রেনগুলো ছেড়ে যায় তার ভেতরে দাঁড়ানোর কোনো জায়গা ছিল না। তবু ছাদ বা পাদানিতে, ইঞ্জিনে একটু সুযোগ পাওয়াটাকেই যেন বড় মনে করেছে তারা। এজন্য জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হননি। ট্রেনের ছাদে চড়া বেআইনি হলেও এ আইন ভাঙাটাকেও যেন সৌভাগ্য মনে করছেন তারা। সব মিলে ইঞ্জিন থেকে ট্রেনের ছাদ সর্বত্র মানুষ আর মানুষ।ছাদে যাত্রী ওঠা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, আনসার, পুলিশ দিয়ে কড়া নজরদারি করেও লাভ হচ্ছে না। কেউ কথা শুনে না। সবাই ব্যস্ত ট্রেনে উঠতে। ট্রেনের ছাদে পুরুষ যাত্রীদের সঙ্গে মহিলা ও শিশুরাও উঠছে বীরদর্পে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এমন শক্তি কিংবা জনবল নেই যে, তাদের ছাদে ওঠা রোধ করা যাবে। বরং বাধা দিলে স্টেশন রণক্ষেত্র হবে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ১২টা পর্যন্ত পাঁচটি বিশেষ ট্রেনসহ মোট ৬৯টি ট্রেন ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা।যেসব ট্রেন বিলমে¡ ছেড়ে যাচ্ছে সে সব ট্রেন বিলম্বেই কমলাপুরে পৌঁছছে। ফলে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের গরমের মধ্যে শিশুদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা মিনিট দেরি করে ছেড়েছে। এছাড়া কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট পর ছেড়েছে। খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলে তা ছেড়েছে ৭টা ২৫ মিনিটে। সকাল ৯টায় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলে সেটি ২ ঘণ্টা দেরি করে ছেড়ে যায়।কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী জানান, ট্রেন চালানোই এখন তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। দেরিতে চলা বিষয় নয়। নিরাপদে ট্রেন চালাতে গিয়ে বিলম¡ হচ্ছে। এক একটি ট্রেন ২-৩ গুণ যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। তার ওপর যাত্রীদের কারণে ট্রেন চালক সামনে দেখতে পারছেন না। রেলওয়ে মহাপরিচালক মো, আমজাদ হোসেন জানান, ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত রেলওয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ট্রেন বিলমে¡ চলাচলা করছে মূলত যাত্রীদের কারণেই। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলছে। ফলে গতি কমিয়ে দিতে হচ্ছে। দেরি হোক, নিরাপদে যাত্রী পৌঁছে দেয়াই এখন আমাদের চালেঞ্জ।গাবতলীতে টিকিটের জন্য হাহাকার : অন্যান্য দিন গাবতলীতে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও শেষদিনের ভিড়ে তা পুষিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শুরু হয় ভিড়। আর বেলা বাড়ার সঙ্গে ঘরমুখো মানুষের ভিড় ততই বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর স্রোতের মতো আসতে থাকে মানুষ। সকাল থেকেই টিকিটের জন্য যাত্রীদের হাহাকার করতে দেখ যায়। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রীরা ছিল চরম হতাশ। ঢাকার আশপাশে জেলার যাত্রীরা টিকিট পেলেও দ্বিগুণ দাম নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এত বিড়ম্বনার মধ্যেও যাত্রীদের মনে ছিল ঘরে ফেরার আনন্দ। আপনজনের ঈদ সে এক অন্যরকম ব্যাপার।একটি ব্যাটারি কোম্পানিতে চাকরি করেন মো. সবুজ। কুড়িগ্রামে শ্বশুরবাড়ি যাবেন। গাবতলীতে এ কী অবস্থা। কোথাও টিকিট নেই। দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরির পর ফিরে যান বাসায়। একই অবস্থা ব্যাংক কর্মকর্তা জনি ও আকাশের। তারা ঈদ করতে ফরিদপুরে যাচ্ছেন। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত টিকিট পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে টিকিট কেটেছেন। বিকাল পর্যন্ত গাবতলীর এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে ঘুরে টিকিট পাননি ইকরাম। ঢাকায় ছোট খাট ব্যবসা করলেও স্ত্রী রিনা বেগম এবং দুই সন্তান রাইয়ান ও রায়হানকে নিয়ে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু গাবতলীতে এসে তিনি কোনো টিকিট পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত লঞ্চে যাবেন বলে জানান তিনি।গাবতলীর ঢাকা-কুষ্টিয়া রুটে চলাচলকারী জননী এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার মো. মাকানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিকালের পর থেকে যাত্রীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের গোল্ডেন লাইন পরিরবহনের কাউন্টার মাস্টার দুলাল হোসেন জানান, গাড়ি স্বাভাবিকভাবেই চলছে। আগে থেকে যেসব যাত্রী টিকিট কেটে রেখেছেন তারাই শুধু যাচ্ছেন। নতুন করে যাত্রীদের আর টিকিট দেয়ার সুযোগ নেই। ঢাকা-ঝালকাঠি রুটের সাকুরা পরিবহনের ম্যানেজার ফারুক হোসেন জানান, এবার ব্যবসা বেশি জমেনি। তবে রাস্তাঘাটে এখনও ওইভাবে যানজট লাগেনি। সকাল থেকে প্রত্যেকটি গাড়িই প্রায় আধাঘণ্টার মতো দেরিতে পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) যেহেতু শেষ দিন। তাই বাড়তি চাপের কারণে যানজট হতে পারে। গাবতলীতে পরিচালিত ভিজিলেন্স টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানান, এবার যাত্রীদের কাছ থেকে তেমন কোনো অভিযোগ আসছে না। তাই ধরেই নেয়া যায় পরিস্থিতি ভালো।লঞ্চে উপচেপড়া ভিড় : সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেষ কর্মদিবস ছিল বৃহস্পতিবার। দুপুর না গড়াতেই এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তা, কর্মচারী অফিস থেকে সোজা সদরঘাটে যান। গন্তব্য গ্রামের বাড়ি। অনেকের কাছে অগ্রিম টিকিট থাকলেও টার্মিনালের কাউন্টারগুলোতে ভিড় ছিল উপচেপড়া। এদের অধিকাংশই গার্মেন্ট শ্রমিক ও নিু ও নিু মধ্যবিত্ত আয়ের লোকজন। সকালের যাত্রীদের অধিকাংশ ছিল ভিআইপি। অগ্রিম টিকিট কাটা থাকায় কাউন্টারে বাড়তি চাপ ছিল না। তবে দুপুর গড়াতেই কাউন্টারগুলোতে চাপ বাড়তে থাকে। বিকালে বিভিন্ন কাউন্টারের সামনে লক্ষ্য করা যায় লম্বা লাইন। ভিড় ও চাপ থাকলেও নির্বিঘ্নেই টিকিট কেটেই ঘরে ফিরতে পারছেন যাত্রীরা। বৃহস্পতিবার সদরঘাটের বিভিন্ন লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই নিয়মিত সদরঘাট থেকে নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর এবং বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন গন্তব্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। এবারে সিডিউল বিপর্যয়ের কোনো আশঙ্কা নেই জানিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্তৃপক্ষ বলছে আমরা অতিরিক্ত লঞ্চ প্রস্তুত রেখেছি। সিডিউলের বাইরেও লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত (দুপুর) যাত্রীদের তরফ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। বুধবার সারাদিনে ছেড়ে গিয়েছিল ১২২টি লঞ্চ। আজ (বৃহস্পতিবার) এর চেয়ে বেশি লঞ্চ সদরঘাট ছাড়বে বলে আশা করছি। লঞ্চকর্মীরা বলছেন, অন্যবার যে পরিমাণ ভিড় হয়, এবার ঈদের দুদিন আগেও তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছে না। সদরঘাটের চাঁদপুরগামী টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, টিকিট নিয়ে যাত্রীরা সহজেই লঞ্চে উঠছেন। ভর্তি হওয়া মাত্রই ছেড়ে যাচ্ছে সদরঘাট থেকে। বাড়তি যাত্রীর চাপ না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কম। ফলে এবার আনন্দের ঈদযাত্রা নৌপথের যাত্রীদের।সায়েদাবাদে চাপ কম : অন্য বছরগুলোতে টার্মিনালে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় থাকলেও এবার তুলনামূলকভাবে চাপ কিছুটা কম। দুপুরে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের আগে যাত্রীর ভিড় স্বাভাবিক। এই সময়ে অন্যান্য বছর যাত্রীর চাপ সামাল দেয়া যায় না। কিন্তু এবার চাপ কম। তবে সন্ধ্যার পরে ভিড় কিছুটা বেড়েছে। তিনি বলেন, সড়কে ভোগান্তি হতে পারে এই আশঙ্কায় দক্ষিণ অঞ্চলের অধিকাংশ যাত্রী লঞ্চে যাতায়াত করছেন। বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, পিরোজপুর, বরগুনা ও বাগেরহাটের যাত্রীরা লঞ্চে যাতায়াত করছেন। খুলনা, গোপালগঞ্জ, বরিশালের কিছু যাত্রী লোকাল বাসে করে মাওয়া ঘাট পর্যন্ত যান। পরে ফেরি পার হয়ে ওপার থেকে ফের লোকাল বাসে করে গন্তব্যে যাচ্ছেন। ইকোনো পরিবহনের ম্যানেজার জহিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সড়কের অবস্থা ভালো। গাড়ির চালক জানান, ঈদে মহাসড়কে ভোগান্তির কথা চিন্তা করে অনেকে লোকাল বাসে ভেঙে ভেঙে বাড়ি ফিরছেন।চাপ কম মহাখালীতেও : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর মহাসড়কে তীব্র যানযট আর সড়কের বেহাল দশার কারণে মানুষ ট্রেন ও লঞ্চের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ বছর ঈদের সময় মহাসড়কে তেমন যানজট নেই। তবু যাত্রীরা মনে করছেন, রাস্তায় তাদের যানজটে পড়তে হবে। এই ভয়ে বাসযাত্রায় অনীহা যাত্রীদের। তবে টার্মিনালে যাত্রী কম থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে পরিবহনগুলোকে।