গ্রেফতারি পরোয়ানার পরও চাকরিতে বহাল

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ লোকাল সাপ্লাই ডিপোর (এলএসডি) খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্তকর্মকর্তা মো. কামাল উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। ৮ জানুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন তিনি। তারপরযথারীতি সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অফিস মেমোরেন্ডাম অনুযায়ী কোনো কর্মচারী গ্রেফতারের পর বা আত্মসমর্পণের পর জামিনে মুক্ত হলেও সাময়িক বরখাস্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করবেন।একইভাবে মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্ত হলেও চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দফতরের নিরাপত্তা প্রহরী রানা কুমার শীলকে বরখাস্ত করা হয়েছে। রানা কুমারের নজির উল্লেখ করে ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মাহবুবুর রহমান খাদ্য অধিদফতরে চিঠি পাঠান। এতে রামগঞ্জের খাদ্য পরিদর্শক মো. কামাল উদ্দিন সরকারকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারির বিষয়ে নির্দেশনা চাওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আদেশ জারি করেনি খাদ্য অধিদফতর।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কামাল উদ্দিন সরকার মঙ্গলবার যুগান্তরকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি এ তথ্য কোথায় জানলেন? বিষয়টি সত্য নয়।’ আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছেন কিনা- জানতে চাইলে ‘হ্যা’ সূচক জবাব দেন। খাদ্য অধিদফতরে এ ধরনের আরও অনেক নজির রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।অভিযোগ উঠেছে, খাদ্য অধিদফতরে বদলি, ছুটি ও বরখাস্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্যমান কোনো নিয়ম-নীতি মানা হচ্ছে না। একজনকে বদলি করে অল্প দিনের মধ্যেই তাকে পুনরায় বদলি করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই মাসের পর মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন কেউ কেউ। কারও কারও ক্ষেত্রে বিধি মানা হলেও প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ নেই। আর এসব নিয়ম না মানার পেছনে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদফতরের প্রভাবশালীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। যারা অনৈতিক সুবিধা দেন না তাদের জন্য বিধিবিধানের খক্ষ সব সময়ই প্রস্তুত থাকে। আর প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করতে পারলেই জোটে লোভনীয় পোস্টিং।লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছিলেন এটিএম সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী। দুর্নীতির মামলায় জামিন নিয়ে তিনি এখন রংপুরের পীরগাছার দায়িত্বে রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি, উল্টো তার পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছিল। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে মঙ্গলবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার চাকরি আছে আর ৩/৪ মাস। এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার অনুরোধও জানান এই কর্মকর্তা।এছাড়া গত বছর চট্টগ্রামের হালিশহর সিএসডির সহকারী ব্যবস্থাপক ফখরুল আলমও চাল পাচারের ঘটনার মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। হাইকোর্ট থেকে তাকে জামিন দিলেও সুিপ্রমকোর্ট তা বাতিল করলে নিু আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। খাদ্য অধিদফতর তাকে বরখাস্ত করলেও আদালতের আদেশে তা স্থগিত রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পুলিশ তাকে খুঁজে না পেলেও তাকে প্রায়ই খাদ্যভবনে দেখা যায়।সাময়িক বরখাস্ত প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস ১-এর ৭৩ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে- ‘ফৌজদারি অভিযোগে অথবা দেনার দায়ে জেলে আটক সরকারি কর্মচারী গ্রেফতার হওয়ার তারিখ হইতে সাময়িক বরখাস্ত বলিয়া বিবেচিত হইবেন এবং বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন।’অভিযোগ রয়েছে, রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নিয়মিত কর্মস্থলে অবস্থান করেন না। তিনি প্রায়ই অফিসে দেরিতে যান। আবার অফিস ছুটির আগেই তিনি অফিস ত্যাগ করেন। বিভিন্ন সময় অফিসের জরুরি কাজে তাকে পাওয়া যায় না। তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে তাকে বারবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও তিনি তা আমলে নেননি। ২ ফেব্র“য়ারি নিরাপদ খাদ্য দিবসের র‌্যালি এবং আলোচনা অনুষ্ঠানে তার অংশ নেয়ার কথা থাকলেও তিনি নেননি। ওই সময় তিনি ভারতে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। সরকারি কর্মচারী হয়ে জাহাঙ্গীর আলমকে বিদেশে যেতে হলে সরকারের অনুমতিসহ বৈদেশিক ছুটি নিতে হবে। তিনি বৈদেশিক ছুটিসহ কোনো ধরনের অর্জিত ছুটি নেননি। ভারতে অবস্থানের ছবি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করেছে রাঙ্গামাটি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। এছাড়া খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছেও লিখিতভাবে এসব অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি খাদ্য অধিদফতর।প্রায় একইভাবে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাহ আল মামুন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর থেকে অদ্যাবধি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।এর সত্যতা নিশ্চিত করে সিলেট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) আবু নইম মোহাম্মদ সফিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, কয়েকদিন পর পর মেডিকেল ইস্যুতে ছুটি চেয়ে চিঠি পাঠান তিনি। তবে সরাসরি তাকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অধিদফতরে চলছে রমরমা বদলি বাণিজ্য। ঢাকার এরিয়া রেশনিং কর্মকর্তা নাইয়ার রানুকে ডি-৬ থেকে খাদ্য অধিদফতরে বদলি করা হয়। তাকে পদায়ন করা হয় সহকারী উপপরিচালক আইডিটিএস পদে। সেখান থেকে তাকে বদলি করা হয় ডি-৯ এ। দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এসব বদলি ও পদায়নের ঘটনা ঘটে। প্রশাসনিক নানা অনিয়মের অভিযোগে খাদ্য অধিদফতরের একজন পরিচালক নাইয়ার রানুকে ডি-৬ থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাকে প্রত্যাহার করা হলেও অল্প দিনের ব্যবধানেই আবার ডি-৯ এ পোস্টিং পাইয়ে দেয়া হয়। রেশনিংয়ের এসব পোস্টিং অত্যন্ত লোভনীয় বলে জানান খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা। ২৯ জানুয়ারি ফরিদপুরের অম্বিকাপুর এলএসডি থেকে ফরিদপুর সদরে বদলি করা হয় সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলমগীর হোসেনকে। তার জায়গায় বদলি করা হয় অম্বিকাপুর এলএসডির সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা শেখ জিকরুল আলমকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে অম্বিকাপুর এলএসডিতে বদলি করা হয়েছিল। অথচ বদলি নীতিমালায় রয়েছে দুই বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো প্রশাসনিক কারণ ছাড়া কাউকে বদলি করা যাবে না।এসব বিষয় নজরে নেই বলে জানিয়েছেন খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান। মঙ্গলবার নিজ দফতরে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এসব বিষয়ে তিনি অবগত নন। বিষয়গুলোর খোঁজখবর নিয়ে আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।