খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিকী ভাবছে বিএনপি

খুলনায় ‘ব্যাপক কারচুপির’ কারণে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় হলেও এতে রাজনৈতিক জয় হয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, আগামী নির্বাচনগুলো কেমন হবে তার একটা ধারণা এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ পেয়েছে। বিশেষ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিএনপি জোট এতদিন যে আন্দোলন করে আসছে, খুলনা সিটি নির্বাচনে তার যৌক্তিকতা জনগণের কাছে প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে আদৌ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।খুলনা সিটি নির্বাচনে পরাজয় ও পরবর্তী করণীয় প্রসঙ্গে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এসব মন্তব্য করেন বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক। তারা জানান, খুলনা সিটি নির্বাচনের ফল নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সেই সঙ্গে গাজীপুরসহ আরও তিনটি সিটি এবং জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি খুলনা সিটি নির্বাচনের নানা অনিয়ম ও কারচুপি তুলে ধরতে দলীয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সদস্যরা প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে অনিয়মের স্থিরচিত্র ও ভিডিও সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। সেটি বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দেয়া হবে। এছাড়া জনসমক্ষে তা প্রকাশেরও পরিকল্পনা রয়েছে।দলটির অধিকাংশ নীতিনির্ধারকদের ধারণা, আগামী নির্বাচনগুলোতে সরকার এর চেয়ে নগ্ন হবে। কারণ সিটি নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। তারপরও সরকার ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে। আর যে নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হবে, সেই নির্বাচন এই সরকারের অধীনে হলে কী হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।তবে পরবর্তী চার সিটি নির্বাচনে কতটা অনিয়ম করতে পারে এর শেষ দেখতে চান তারা। তাই নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও আপাতত বাকি সিটি নির্বাচন বর্জনের কোনো চিন্তাভাবনা তাদের নেই। এসব নির্বাচনে জয়-পরাজয় যাই হোক তা থেকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চিন্তাভাবনা তাদের।জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ক্ষমতাসীন দল যে জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাস করে না, তা বিগত ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনেই বিশ্ববাসী দেখেছে। সর্বশেষ খুলনা সিটি নির্বাচনের নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সরকার পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। ভোটের নামে তামাশা চলছে। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না সেটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ সরকার। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। সেনা মোতায়েন করতে হবে। না হলে সুষ্ঠু ভোট সম্ভব নয়।তিনি বলেন, খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে আমরা সে শঙ্কা করেছিলাম সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের লোকজন ধানের শীষের এজেন্টকে বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে জানানোর পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আগামী নির্বাচন কেমন হবে, এর একটা বার্তা আমরা পেলাম। এ নির্বাচন থেকে আমরা নতুন শিক্ষা নিয়েছি। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে থাকব কি না তা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।খুলনায় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে কী অর্জন হল জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, এটাকে আমরা পরাজয় মানছি না। আমাদের জয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার ছিনতাই হয়েছে। আমরা ভোটাধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন করছি। আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় এটা বারবার বলে আসছি। খুলনায় সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। সিটি নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ফলে সরকার ও নির্বাচন কমিশনই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই জন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি কারও পাতা ফাঁদে পা দেবে না। ভেবেচিন্তে সময়মতো কার্যকর কর্মসূচি দেবে। বেশিরভাগ জনগণ যখন যেভাবে কর্মসূচি প্রত্যাশা করবে সেভাবেই কর্মসূচি আসবে। ভোট কারচুপির মাধ্যমে সরকার এমনিতেই বেকায়দায় পড়েছে। তাই এই মুহূর্তে কর্মসূচি না দিয়ে খুলনা সিটি নির্বাচনের ভয়াবহ ভোট কারচুপির আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বের করার দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। এতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জনসমক্ষে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।তারা মনে করেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের পাশাপাশি নিরপেক্ষ প্রশাসন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান প্রশাসন মনে করছে এ সরকার সহজেই পরিবর্তন হচ্ছে না বা তারা তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে তাই তারা নির্লজ্জভাবে সরকারের পক্ষে কাজ করছে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করতে হলে তাদের মধ্যে এমন একটা বার্তা দিতে হবে যাতে তারা মনে করেন, এই সরকারই শেষ সরকার নয়। এ সরকার আর বেশিদিন নেই। এমন একটা বার্তা পেলেই তারা নিরপেক্ষ আচরণ করবে। সেই ধরনের একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে।সূত্র জানায়, খুলনা সিটিতে পরাজয়ের পর গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়েও বিএনপিতে নানা শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। খুলনার মতো নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটের দিন পোলিং এজেন্টদের আসতে বাধা দেয়াসহ ভোট কেন্দ্র দখলের একই চিত্র গাজীপুরেও ঘটতে পারে।খুলনার মতো এত কম আয়তনের সিটিতে তা মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। পক্ষান্তরে গাজীপুরের আয়তন খুলনার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। সেখানে কেন্দ্র পাহারা দেয়া ও কারচুপি মোকাবেলা কঠিন হবে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধিারকরা। ইতিমধ্যে গাজীপুরে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান চলছে।নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর তা আরও বাড়বে। পুরনো মামলার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন মামলা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খুলনা সিটি নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যুগান্তরকে বলেন, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার ও ইসি প্রমাণ করেছে তাদের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা আরও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি, বর্তমান প্রশাসন সরকারের আজ্ঞাবহ। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে দীর্ঘদিন যে দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি তাও সঠিক।তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন না হলেও তারা ভোট ডাকাতির আশ্রয় নিয়েছে। এ সরকারের অধীনে সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনে এ ডাকাতির মাত্রা ভয়াবহ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই ডাকাতির সেই নির্বাচনে জেনেশুনে দেশবাসী সমর্থন দেবে বলে মনে হয় না।তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে কারচুপিসহ সরকারের নানা ব্যর্থতা তুলে ধরে একটা কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই আন্দোলন শুধু বিএনপির একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য সব রাজনৈতিক দল ও সচেতন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে একই প্ল্যাটফরমে আনতে হবে। সবাই মিলে ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে যোগ দিলে সরকার দাবি মানতে বাধ্য হবে।