অবরোধকারীদের ওপর পুলিশের কাঁদানে গ্যাস

দিনভর অবরোধের পর রোববার রাতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে শাহবাগ থেকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের উঠিয়ে দেয় পুলিশ- সমকালকোটা সংস্কারের দাবিতে শাহবাগে রাজপথ অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে তুলে দিয়েছে পুলিশ। লাঠিপেটায় ছত্রভঙ্গ শিক্ষার্থীরা রাত সাড়ে ৮টার দিকে আবারও রাস্তায় নামলে তাদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। আন্দোলনকারীরা সড়কে আগুন ধরিয়ে বাধা সৃষ্টি করে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে। তাদের দমাতে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের শতাধিক আহত হয়েছেন। থেমে থেমে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল গভীর রাত পর্যন্ত। আন্দোলনকারীরা একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন চত্বরে ভাঙা আসবাবপত্র এবং একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});এর আগে রাত দেড়টার দিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ শিক্ষাঙ্গন ও হলে ফিরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। আজ সোমবার বেলা ১১টায় দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কোটা সমস্যা নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।নানক বলেন, তিনি সরকারের পক্ষ থেকে এখানে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী পুরো ঘটনা অবগত। আন্দোলনকারীদের মধ্যে যাদের আটক করা হয়েছে, এরই মধ্যে তাদের ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি চক্র নানা গুজব ছড়িয়ে শিক্ষাঙ্গন অস্থিতিশীল করতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনকারী কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য এর আগে পুলিশের ‘হামলার প্রতিবাদে’ আজ সোমবার সারাদেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডেকেছিলেন আন্দোলনকারীরা।এ রিপোর্ট লেখার সময়ও আন্দোলনকারীরা শাহবাগ থানার অদূরে অবস্থান করছিলেন। সর্বশেষ রাত ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবন চত্বরে কিছু ভাঙা আসবাবপত্র জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় একটি গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগানে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদযাত্রা করে শাহবাগে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। দেশের সব জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ ব্যানারে পূর্বঘোষিত পদযাত্রা কর্মসূচি পালিত হয়। দুপুর ২টায় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জমায়েত হন। কয়েক হাজার আন্দোলনকারী রাজু ভাস্কর্য থেকে নীলক্ষেত, কাঁটাবন ঘুরে বিকেল ৩টার দিকে শাহবাগে অবস্থান নেন।অন্যত্র কর্মসূচি সন্ধ্যার আগে শেষ হয়ে গেলেও ঢাকায় আন্দোলনকারীরা দাবি পূরণের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বিকেল ৩টায় শাহবাগে বসে পড়েন। টানা পাঁচ ঘণ্টার অবরোধে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় রাজধানীতে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন কাজ শেষে ঘরমুখো মানুষ।আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে তুলে দিতে বিকেলে কয়েকবার চেষ্টা করে পুলিশ। তবে শক্তি প্রয়োগ করেনি। আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে গোলাপ ফুল দিয়ে ধন্যবাদ জানায়। সন্ধ্যার পর চিত্র বদলে যায়। রাত ৮টার দিকে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। লাঠিপেটার মুখে ছত্রভঙ্গ আন্দোলনকারীরা শাহবাগ ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ও গ্রন্থাগারের সামনে চলে যান।রাত ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা সংঘবদ্ধ হয়ে টিএসসি ও চারুকলার সামনে অবস্থান নেন। তারা টিএসসি থেকে চারুকলা পর্যন্ত সড়কে অন্তত ১০টি জায়গায় টায়ার ও কাঠ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। আন্দোলনকারীদের ধাওয়ার মুখে পুলিশ শাহবাগের দিকে পিছিয়ে আসে। পুলিশের রাবার বুলেটের মুখে শিক্ষার্থীরা আবার পিছিয়ে যায়। এ সময় একজন শিক্ষার্থীর শরীরে কাঁদানে গ্যাসের শেল লাগলে তিনি সড়কে লুটিয়ে পড়েন। তাকে শিক্ষার্থীরা নিয়ে যান। তার নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে কয়েক দফা। সংঘর্ষে আহত অন্তত ৩৫ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ১১ পুলিশসহ আরও কয়েক শিক্ষার্থী বিএসএমএমইউ এবং বারডেমে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের চোখে আঘাত লেগেছে। লাঠিপেটায় সাংবাদিক, পথচারীসহ আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে রাত দেড়টা পর্যন্ত পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে রাত সোয়া একটার দিকে ঢাবির রোকেয়া হলসহ কয়েকটি হলের শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। উত্তেজিত একদল শিক্ষার্থী ভিসির বাসভবনের মূল গেট ভাঙার চেষ্টা করে।এর আগে রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহের হোসেন প্রিন্স, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সাইফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল আন্দোলনকারীদের মারধর করে। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে গেলে হামলাকারীরা ক্যামেরা ছিনিয়ে নেন। মোতাহের হোসেন প্রিন্স দাবি করেন, আন্দোলনকারীরা টিএসসিতে ভাংচুর করতে গেলে ছাত্রলীগ কর্মীরা বাধা দেন।সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ বিভিন্ন কোটার প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীরা। আন্দোলনকারীদের দাবি, ১০ শতাংশের বেশি কোটায় নিয়োগ দেওয়া যাবে না। গত ফেব্রুয়ারি থেকে টানা আন্দোলন চললেও গতকাল তা সহিংস রূপ নেয়।এর আগে গত মাসে আন্দোলনকারীদের দাবিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেয়, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, চাকরিতে কোটা শিথিল করা হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে তাদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য কোটা থাকবে। কোটা শিথিল হলেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের দাবি পূরণ হয়নি। কোটা ব্যবস্থার প্রকৃত সংস্কার হয়নি।রাজধানী ছাড়াও গতকাল সব জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পদযাত্রা এবং বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। পদযাত্রা শেষে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহরে বিক্ষোভ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা। এতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। সিলেটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে পদযাত্রা করেন শিক্ষার্থীরা। ময়মনসিংহের বাইপাস এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এ সময় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।